Thursday, June 25, 2026
HomeArticlesResearch & Scholarly“মার্ক্সবাদ সত্য কারণ ইহা বিজ্ঞান” সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা

“মার্ক্সবাদ সত্য কারণ ইহা বিজ্ঞান” সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা

“মার্ক্সবাদ সত্য কারণ ইহা বিজ্ঞান” এই আপ্তবাক্য মার্ক্সবাদীরা সব সময়ে বলে। এটা ওদের দেওয়াল লিখনেও দেখা যায়। মার্ক্স  ও এঙ্গেলস খুব চতুর দুই ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা জানতেন যে বিরাজমান ব্যবস্থাপনাকে বদলে নতুন ব্যবস্থাপনা চালু করতে তাকে একটা বৌদ্ধিক, নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক কাঠামো দিতে হবে। আমাদের এই বিশ্ব ও তার কার্যকারিতার উত্তর দেওয়ার জন্য নিছক অর্থনীতির বাইরে গিয়ে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভিত্তিতে কিছু ধারণা তৈরি করতে হবে। কমিউনিস্টদের বড় গর্বের জায়গা এটা, এই তত্ত্ব একেবারে বিজ্ঞানের মতো অকাট্য তাই তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ান, বলেন মার্ক্সবাদ একটা বৈজ্ঞানিক মতবাদ। এটা অদ্ভুত যে হাজার হাজার বছরের গভীর চিন্তা, অধ্যয়ন, গবেষণা, আলোচনা, মতবিনিময় ও বিতর্কের উপরে নির্মিত চিরায়ত বৌদ্ধিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যকে হটিয়ে দেবে মাত্র দু’ জন ব্যক্তিত্বের  উদ্ভুত তত্ত্ব? তাঁরা যতই বুদ্ধিমান হোন এটা অসম্ভব! এই বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা ঔদ্ধত্যের জন্য বিশিষ্ট কিন্তু সেটা যুক্তি, কারণ ও বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না। এখন মার্ক্স ও এঙ্গেলসের উদ্ভুত তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করব আমরা। (মার্ক্সবাদ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা)

কমিউনিস্ট দর্শন দাঁড়িয়ে আছে বস্তুবাদের উপরে। তাদের বিশ্বাস এই মহাবিশ্বে বস্তু ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব নেই। বস্তুই একমাত্র সত্য এবং এই সত্যকে জানার একমাত্র পথ বিজ্ঞান। কমিউনিস্ট দর্শন একেবারে গোড়ার তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করে।

১। প্রকৃতিতে শক্তি ও গতির উৎস কী?

২। ছায়াপথ, গ্রহ,নক্ষত্র, প্রাণী, উদ্ভিদ এসবের পরিমাণ কেন অনবরত বেড়ে চলে?

৩। জীবনের মূল কী এবং কীভাবে চেতনার উদ্ভব হল?

মার্ক্সবাদ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা
মার্ক্সবাদ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা

মার্ক্স-এঙ্গেলস এই তিনটে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তাঁদের তিনটি সূত্রের ভিত্তিতে।

১। বিপরীতের সূত্র

মার্ক্স ও এঙ্গেলস দাবি করেন যে যা কিছু অস্তিত্ববান তার সৃষ্টি হয়েছে বিপরীত বলের সমন্বয়ে।  বিদ্যুৎের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান বা চার্জ থাকে। পরমাণু তৈরি হয় প্রোটন ও ইলেক্ট্রন দিয়ে যারা দুটো বিপরীত আধান বা চার্জ বহন করে। প্রতিটা মানুষ দুটো বিপরীত বৈশিষ্ঠ্য দ্বারা গঠিত- সাহস ও কাপুরুষতা, সামাজিক ও সমাজবিরোধী  চরিত্র, ঔদ্ধত্য ও বিনয়, পুরুষত্ব ও নারীত্ব, স্বার্থপরতা ও নিঃস্বার্থতা। মার্ক্স ও এঙ্গেলস এই সিদ্ধান্তে এলেন যে যা কিছুর অস্তিত্ব আছে তার অবশ্যই দুটো সমান ও বিপরীত অংশ আছে।

কমিউনিজম বিশ্বাস করে যে এই দুটো বিপরীত বলের উপস্থিতির কারণেই সব কিছুই স্বয়ং-চালিত ও গতিময় হয়। এই ধারণার প্রথম উদ্গাতা জর্জ উইলহেল্ম হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) তিনি বলেছিলেন প্রকৃতিতে বৈপরীত্যই সব গতি ও জীবনের মূল। এটাকে বলে ডায়ালেকটিক বা দ্বান্দ্বিকতা আর এটাই কমিউনিস্ট দর্শনের কেন্দ্রীয় ভাবনা। কমিউনিজমের মৌলিক বিশ্বাস প্রকৃতির সব গতি ও জীবন দুটো বিপরীত বলের মধ্যে অনবরত দ্বান্দ্বিক ক্রিয়ার ফলে উদ্ভুত। এই বিশ্বাস থেকে তারা এই আদর্শকে প্রতিটা একক ঘটনা, আন্তঃক্রিয়া  ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রসারিত করেছে, তারপর সেটাকেই দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষের আকারে দেখা হয়। এটাই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ।

কমিউনিস্টদের বিশ্বাস যে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ প্রকৃতির প্রত্যেকটা ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ কথা মানেন না। এই সূত্র আগে থেকেই ধরে নিয়েছে যে বস্তুর মধ্যে দুটো বিপরীত বল আছে। এই পূর্বানুমান বিজ্ঞানের যুক্তিতে ধোপে টেকে না কারণ দুটো বিপরীত বল কখনো একত্রে আসতে পারে না তাদের নিজেদের মধ্যে শক্তি না থাকলে। প্রকৃতিতে বিপরীত বলগুলোর নিজেদের শক্তি থাকে আর সেটা পরস্পরের থেকে স্বতন্ত্র আর সেটা তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব বা মিথস্ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে না। তাদের একত্রে আনলে তাদের দুটো শক্তি মিলিত হয়। অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন যে কমিউনিস্টদের বিপরীতের সূত্রে গতির ব্যাখ্যা মেলে না, এটা তারা ধরে নেয়। আর এক জন পণ্ডিত ব্যঙ্গের সুরে বলেছেন, “এক হাজার মৃত পুঁজিপতি ও এক লাখ মৃত কমিউনিস্ট যতটা শ্রেণি সংগ্রাম করতে পারে দুটো নিস্ক্রিয় মৌল তার চেয়ে বেশি সংঘর্ষ করতে পারে না।“

২। অস্বীকারের সূত্র

মহাবিশ্বে শক্তি ও গতির উৎস ব্যাখ্যা করার পরে মার্ক্স ও এঙ্গেলস প্রকৃতি কেন সব সময়ে সব কিছুর পরিমাণ বাড়াতে চায় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলেন—ছায়াপথ, গ্রহ নক্ষত্র থেকে প্রাণী ও উদ্ভিদ সব কিছু। তারা সিদ্ধান্তে এলেন যে প্রতিটা সত্ত্বা নিজেকে অস্বীকার করে বা শেষ করে দেয় নিজেকে আরো বেশি পরিমাণে বহুগুণিত করতে চায়। তাঁরা উদাহরণ দিলেন যে একটা বীজ নিজেকে নিঃশেষ করে গাছে পরিণত হয়। তারপর সেই গাছ বাড়ে ও আরো অনেক বীজের জন্ম দেয়। মৃত্যু ও বেশি পরিমাণে পুনর্জন্মের এই চক্র প্রকৃতিতে অনবরত চলতে থাকে। এটাকে বিপরীতের সূত্র দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। যে কোনো জিনিসের ভিতরে  একাধিক বল দ্বন্দ্বের মাধ্যমে শক্তি ও গতি সঞ্চার করে, সেই বলগুলো নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় নির্গত শক্তি একই প্রকারের আরো সত্ত্বা বা বস্তু বা জিনিসের জন্ম দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন যে অস্বীকারের সূত্র কিছুই ব্যাখ্যা করে না। এটা শুধু কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা বর্ণনা করে। এটা সত্যি যে প্রকৃতি আরো বেশি পরিমাণে নিজেকে পুনরুৎপাদিত করে কিন্তু সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে বাবামায়ের মৃত্যু অবধারিত নয়। অনেক প্রাণী ও সত্ত্বা আছে যারা নিজেদের বিলুপ্তির আগে অনেকবার পুনরুৎপাদন করে। ‘অস্বীকার’ ও ‘পুনঃসৃষ্টি’র মধ্যে       কোনো ‘কারণ ও ফল’এর সম্পর্ক নেই।

৩। রূপান্তর সূত্র

প্রকৃতিতে সংখ্যাগত বৃদ্ধির ব্যাখ্যা দিতে পেরেছেন বলে ধরে নিয়ে মার্ক্স ও এঙ্গেলস সৃষ্টির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে উদ্যত হলেন।  এই সূত্র বলে যে প্রকৃতিতে যেমন কিছু সময় ধরে পরিমাণগত বৃদ্ধি ঘটে, তেমনি এর থেকে গুণগত বৃদ্ধিও ঘটে আবার তা থেকে নতুন আকৃতি ও নতুন সত্ত্বার জন্ম হয়। যেমন রসায়ন বিজ্ঞানে মিথেন তৈরি হয় কার্বনের একটা পরমাণু ও হাইড্রোজেনের চারটে পরমাণু দিয়ে। এখন আমরা যদি তাতে কার্বনের একটা পরমাণু ও হাইড্রোজেনের দুটো পরমাণু যোগ করি , অর্থাৎ শুধু পরিমাণগত বৃদ্ধি ঘটাই, কারণ সেই কার্বন আর হাইড্রোজেন পরমাণুই থাকছে, আমরা সম্পূর্ণ আলাদা একটা রাসায়নিক যৌগ পাই যার নাম ইথেন। এইভাবে যদি আমরা কার্বন ও হাইড্রোজেনের পরমাণু বাড়াতে থাকি তবে আমরা সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা রাসায়নিক পেতে থাকি যেমন প্রপেন, বিউটেন, পেনটেন, ইত্যাদি। মার্ক্সবাদ বিশ্বাস করে যে এইটা ঘটে প্রকৃতির সহজাত সৃষ্টিশীল ক্ষমতার কারণে, সেটা শুধুমাত্র পরিমাণগত বৃদ্ধি নয়,  গুণগত উল্লম্ফন দেওয়ার ক্ষমতাও থাকে। আর তাই সব নতুন আকার ও সত্ত্বার জন্ম হয়।

রূপান্তরের এই একই নীতির ভিত্তিতে মার্ক্স ও এঙ্গেলস জীবনের ব্যাখ্যা করে দিলেন। তাঁরা বললেন যে রূপান্তরের উল্লম্ফনের দ্বারা জটিল রাসায়নিক কাঠামো থেকে জীবনের উদ্ভব। রূপান্তরগত উল্লম্ফনের একই প্রক্রিয়া ক্রমবর্ধমান জটিল জীবনের আকৃতি ও শেষাবধি চেতনার সৃষ্টি হয়। যেখানে বিজ্ঞান এখনো হিমসিম খাচ্ছে কীভাবে জীবন ও চেতনার উদ্ভব হল কমিউনিজম বহু আগে তার উত্তর বলে দিল!

এই সূত্রও প্রকৃতির একটা ঘটনার বর্ণনা দেয় কিন্তু এর কার্যকারণ ব্যাখ্যা করে না। এটা বলে যখন মিথেনে আরো পরমাণু যোগ করা হয় তখন কী ঘটে কিন্তু এটা ব্যাখ্যা করতে পারে না কীভাবে হাইড্রোকার্বন সৃষ্টি হয় এবং কেন নতুন নতুন গুণাবলি উৎপন্ন হয়। অনুরূপভাবে কীভাবে জটিল রাসায়নিক অণু থেকে জীবনের উদ্ভব হল সেই ব্যাখ্যার ধারে কাছেও যেতে পারে না।  শুধুমাত্র পরিমাণগত সংঘবদ্ধতার কারণে এইরূপ উল্লম্ফন ঘটে তাঁদের এই অনুমান বিজ্ঞানের যুক্তির সামনে উড়ে যায়।

পড়ুন : প্রাচীনতম সভ্যতার উৎসস্থল কোথায়?

মার্ক্সবাদ অনুসারে গতির জন্য কোনো বাইরের শক্তির উৎস প্রয়োজন হয় না। তাঁদের এই প্রচেষ্টার পিছনে  এইটা উদ্দেশ্য ছিল যে প্রকৃতির নিজস্ব ক্ষমতা আছে এবং তার জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই। সুতরাং অন্য সব ধর্ম  যেমন নিজস্ব সংস্কার দিয়ে তৈরি সেখানে বিজ্ঞানের কোনো জায়গা নেই তেমনই মার্ক্সবাদও তাই। সুতরাং মার্ক্সবাদ সেইরূপ একটা রিলিজিয়ন। কিন্তু অন্য রিলিজিয়ন মানুষের মনস্তত্ত্ব ও অন্তঃপ্রকৃতিকে গুরুত্ব দেয় মার্ক্সবাদ তাও দেয় না। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মার্ক্সবাদ ভুলে যায় যে মানুষের জটিল গহন মনের এবং বহু সংখ্যক মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য কিছু একই ধরণের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া দরকার। বিপুল সংখ্যক মানুষকে শান্ত রাখা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। সেটা সমাধান করতেই চিন্তাবিদরা হিমসিম খান এবং তাঁরা নানা উপায় বাৎলান। এইরকম একটা উপায় ধর্মভাবনা সেটা সর্বরোগহর কিনা জানা নেই তবে এর থেকে ভিন্নতর উন্নততর কোনো উপায়ও এখনো মানুষ বাৎলাতে পারেনি।

তবে সব শেষে মার্ক্সবাদ যে বিজ্ঞান নয় একথা জোর দিয়ে বলা যায়।

সুদীপনারায়ণ ঘোষ

আরও পড়ুন : অজানা ইস্রায়েল – সুদীপনারায়ণ ঘোষ

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments