অনেক তো আলোচনা হলো আদর্শ রামরাজ্য নিয়ে, এবার আসুন দেখে নেওয়া যাক কৃষক শ্রমিক পার্টির সরকার দেশে এলে সেটা কেমন হবে? (আদর্শ বামপন্থী রাজ্যে কিছুদিন)
কার্ল মার্ক্সের তত্ত্ব খুব জটিল না করে চপ শিল্প দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। ধরুন আপনি আদর্শ বামপন্থী দেশে রয়েছেন; আপনি ও আপনার বন্ধু খুলেছেন চপের দোকান। আপনি বেশি পরিশ্রম করে ২০০টি চপ ভাজলেন এবং আপনার বন্ধু ১০০টি। দিনশেষে আপনার আয় হলো ১০০০, আপনার বন্ধুর ৫০০। এখন সমস্যা হলো, আদর্শ কমিউনিস্ট দেশে নিজস্ব সম্পত্তি বলে কিছু হয় না, সবই সরকারের। ফলে আপনি ও আপনার বন্ধু দিনের উপার্জনকড়ি নিয়ে স্থানীয় পার্টি অফিসে জমা দিতে ছুটলেন। সেখানে বসে থাকা কমরেড হিসাব কষে রায় দিলেন: “যেহেতু আপনার বন্ধুর পরিবার বড়, তাই তাকে দিতে হবে ৮০০ টাকা; আর আপনি একা মানুষ, আপনার ৬০০ টাকাতেই চলে যাবে।” তাই অর্থনৈতিক সাম্যাবস্থা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত। বাকি ১০০ টাকা? ওটা ‘পার্টি ফান্ডের‘ প্রশাসনিক খরচ!
পরদিন থেকে আপনি আর ২০০টি চপ ভাজলেন না, বরং বন্ধুর মতো ১০০টি ভাজাই লাভজনক মনে করলেন।
কিছুদিন যেতে না যেতেই একদিন সকালে চপের দোকানে গিয়ে দেখলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য। কড়াইয়ে তেল ফুটছে ঠিকই, কিন্তু চপ তৈরির প্রধান উপকরণ—সেই আলুর কোনো চিহ্ন নেই। শুধু আমার দোকানে নয়, গোটা রাজ্যে আলুর হাহাকার।

খবর নিয়ে যা জানতে পারলাম, তা রাশিয়ার ‘হলডোমোর‘ বা চীনের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড‘-এর সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। গ্রামে গ্রামে কৃষকরা আলু চাষ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। কেন? কারণ আদর্শ সাম্যবাদী রাষ্ট্রের নিয়মে চাষি কতটা পরিশ্রম করল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পার্টি অফিসের বণ্টন নীতি। একজন চাষি হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ১০০ কুইন্টাল আলু ফলালেও, দিনশেষে তাকে সেইটুকুই দেওয়া হয়েছে যা কমরেডদের মতে তার ‘বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট‘। বাকি সবটুকু ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ‘ বলে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
চাষিরা দেখল, রোদে পুড়ে বেশি ফলন ফলিয়েও যদি কম পরিশ্রম করা চাষির সমান বা তার চেয়েও কম খাবার জোটে, তবে শুধু শুধু ঘাম ঝরানোর মানে কী? মানুষের সহজাত কর্মস্পৃহা আর লাভের আশা যখন রাষ্ট্রীয় ছাঁচে পিষ্ট হলো, তখন লাঙল থমকে গেল।
আলুহীন কড়াইয়ের ধাক্কায় যখন গোটা রাজ্যের সাধারণ মানুষ চপ তো দূর, দু–মুঠো ভাতের জন্য রেশন দোকানের সামনে মাইলের পর মাইল লাইনে দাঁড়িয়ে হাহাকার করছে,ঠিক তখনই একদিন মাঝরাতে একটা চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ল।
পার্টি অফিসের পেছনের অন্ধকার গলি দিয়ে একটা বিলাসবহুল বিদেশী গাড়ি এসে দাঁড়াল বড় কমরেডের বাংলোর সামনে। গাড়ি থেকে নামানো হতে লাগল দামি বিদেশী মদ, সুগন্ধি চাল, উন্নতমানের মাংস আর শৌখিন সব বুর্জোয়া বিলাসিতার সামগ্রী।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আদর্শ বামপন্থা আপনার শুধু পকেট নয়, আপনার রুচি আর অস্তিত্বকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আপনি হয়তো চেয়েছিলেন চপের দোকানে একটা সুন্দর নীল রঙের সাইনবোর্ড লাগাতে বা নিজের বাড়িটা একটু শৌখিনভাবে রাঙাতে। কিন্তু কমরেড বলবেন, “না, ওসব তো বুর্জোয়া বিলাসিতা!”
তাদের রাষ্ট্রে আপনার ঘর হবে পাশের বাড়ির হুবহু কার্বন কপি। একই মাপের জানালা, একই একঘেয়ে ধূসর রঙের দেয়াল, আর একই নকশার বারান্দা। একেই বলে ‘আর্কিটেকচারাল ইউনিফর্মিটি‘। সেখানে আপনি কোনো ব্যক্তি নন, বরং বিশাল এক যন্ত্রের একটি ছোট নাট–বল্টু মাত্র। আপনার পছন্দ, অপছন্দ বা সৃজনশীলতা সেখানে রাষ্ট্রীয় ছাঁচে পিষ্ট।
আলুহীন কড়াইয়ের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই একদিন বিকেলে বাজারের মোড়ে এক শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য দেখলাম। গ্রামের একজন অত্যন্ত হিসেবি আর পরিশ্রমী কৃষক—যাকে সবাই চেনে শান্ত ভদ্র মানুষ হিসেবে—তাকেই চোর–ডাকাতের মতো চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে লাল বাহিনীর একদল সশস্ত্র ক্যাডার। বুটের লাথি আর রাইফেলের বাঁটের গুঁতো মারতে মারতে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পার্টি অফিসের দিকে।
তার অপরাধ কী? সে কি রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুঠ করেছে? নাকি কোনো দাঙ্গা বাঁধিয়েছে?
না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, তার অপরাধ আরও ‘ভয়ংকর‘। পার্টি অফিস থেকে তার পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যে টাকা ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, সে তার প্রতিবেশীদের মতো সেই পুরো টাকাটা উড়িয়ে দেয়নি। শৌখিন জিনিস বা বুর্জোয়া বিলাসিতায় খরচ না করে, সে প্রতি মাসে সেই টাকা থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে রেখেছিল। নিজের পরিশ্রমের ফসল আর সেই জমানো টাকা দিয়ে সে নিজের ভাঙা চালটা একটু মেরামত করেছিল এবং চাষের জন্য দুটো বাড়তি বলদ কিনেছিল। ব্যাস! প্রতিবেশীদের চেয়ে তার জীবনযাত্রা সামান্য একটু উন্নত হতেই কমরেডদের কপালে ভাঁজ পড়ল।
কমরেডদের ডায়েরিতে তার নামের পাশে লাল কালিতে লেখা হলো—“নব্য বুর্জোয়া শোষক“।
পার্টি অফিসের বারান্দা থেকে কমরেড হুংকার দিলেন, “কমরেডগণ, দেখে রাখুন এই সমাজদ্রোহীকে! যেখানে আমাদের রাজ্যে সবাই সমান, সেখানে এই লোকটা একা একটু বেশি বড়লোক হয়ে যাওয়ার ধৃষ্টতা দেখায় কী করে? সবার ঘরে যখন একঘেয়েমি, তখন ওর ঘরের চাল এত মজবুত কেন? এ তো ঘোর পুঁজিবাদী মানসিকতা! এ হলো সেই ভারতবর্ষের প্রাচীন মনুবাদী ব্যবস্থার মতো উচ্চ–নীচ ভেদাভেদ তৈরি করার চেষ্টা। আমাদের সমাজতান্ত্রিক স্বর্গে কোনো ব্যক্তিগত সঞ্চয় চলবে না। এখানে সঞ্চয় মানেই হলো প্রতিবেশীর হক মেরে খাওয়া!”
সেই কৃষকের জমানো প্রতিটা পয়সা এবং তার সেই বলদ দুটোকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি‘ ঘোষণা করে বাজেয়াপ্ত করা হলো। আর তাকে ‘শ্রম শিবিরের‘ অন্ধকুঠুরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো—যাতে তার মগজ থেকে এই ‘ব্যক্তিগত উন্নতির বিষ‘ চিরকালের মতো ধুয়ে মুছে সাফ করা যায়।
সেদিন সকালে কমিউনিস্ট স্বর্গরাজ্যের আকাশে এক কালবৈশাখী ঝড় উঠল।
একদল সশস্ত্র লাল–সেনা ঘিরে ফেলেছে দেশের প্রধান গবেষণাগার। অপরাধ? এক বিজ্ঞানী দুঃসাহস দেখিয়েছেন সত্য বলার। তিনি বামপন্থীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ সমান ‘ব্ল্যাঙ্ক স্টেট থিওরি‘ (Blank Slate/state Theory)-তে কুঠারাঘাত করেছেন।
পড়ুন : বাঙালির প্রথম গণ অভ্যুত্থানের বিস্মৃত আখ্যান
ব্ল্যাঙ্ক স্টেট থিওরিটা কী?
সহজ ভাষায়, বামপন্থীদের বিশ্বাস হলো—মানুষ যখন জন্মায়, তখন সে একটা নতুন কেনা হার্ড ড্রাইভ বা ব্ল্যাঙ্ক মেমরি কার্ডের মতো থাকে। একদম ফাঁকা, সাদা স্লেট। তার নিজের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই, দক্ষতা নেই। রাষ্ট্র তাকে যা শেখাবে, সে তাই হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র যদি চায় তবে একদল মানুষকে রোবট বানিয়ে দেবে, আর চাইলে সবাইকে একই ছাঁচে ঢালাই করবে। তাদের মতে, মানুষের জিন বা ডিএনএ বলে কিছু নেই; পরিবেশই সব।
কিন্তু সেই বিজ্ঞানী বুক ফুলিয়ে বলে বসলেন, “কমরেড, আপনারা ভুল! মানুষ জন্মের সময় ফাঁকা স্লেট নয়। মা–বাবার থেকে সে পায় শারীরিক গঠন, মেধা আর চরিত্রের বীজ—যাকে আমরা বলি জেনেটিক্স। কেউ জন্ম থেকেই দৌড়াতে পটু হয়, কেউ বা অঙ্ক কষতে।“
ব্যস! এই কথা শোনা মাত্রই প্রধান কমরেডের মুখ লাল হয়ে উঠল। টেবিল চাপড়ে তিনি হুংকার ছাড়লেন, “থামুন বুর্জোয়া দালাল! আপনি তো দেখছি বিজ্ঞানের নামে নব্য–নাৎসিবাদ ছড়াচ্ছেন! জন্ম থেকেই কেউ বেশি শক্তিশালী আর কেউ দুর্বল—এ তো সেই ভারতবর্ষের বামুনদের মনুস্মৃতির প্রতিধ্বনি! ক্ষত্রিয়রা জন্ম থেকেই যোদ্ধা আর শূদ্ররা সেবক—এই বিভাজন তো আপনি জিনের নামে স্থাপন করতে চাইছেন? এ তো ঘোর মনুবাদ!”
কমরেডদের কাছে ‘জেনেটিক্স‘ তখন কোনো বিজ্ঞান নয়, বরং এক ভয়ংকর ‘ফ্যাসিস্ট অপবিজ্ঞান‘। তাদের যুক্তি পরিষ্কার—যদি জন্মগত পার্থক্য স্বীকার করা হয়, তবে ‘শ্রেণিহীন সমাজ‘ গড়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। কারণ সবাই যদি সমান মেধা নিয়ে না জন্মায়, তবে জোর করে সবাইকে সমান করা সম্ভব নয়।
তাই বিজ্ঞানের যুক্তিকে তাত্ত্বিক হঠকারিতা দিয়ে চাপা দেওয়া হলো। কমরেড ঘোষণা করলেন, “এই বিজ্ঞানী আসলে ছদ্মবেশী মনুবাদী। তিনি মানুষের সাম্যকে অস্বীকার করে বংশের দোহাই দিচ্ছেন। এনার রক্তে বর্ণবাদের বিষ!”
বিচারের প্রহসন চলল না। প্রকাশ্য দিবালোকে, হাজারো মানুষের সামনে সেই বিজ্ঞানীকে হাঁটু গেড়ে বসানো হলো। তার অপরাধ? তিনি প্রকৃতির সত্যকে রাষ্ট্রের মিথ্যার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। মনুবাদী অপবাদ দিয়ে তাকে গুলি করা হলো। বন্দুকের শব্দে যখন তার মাথা নুয়ে পড়ল, তখন কমরেডরা হাততালি দিয়ে উঠলেন— “যাক, আজ এক বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীলের মৃত্যু হলো। মনে রেখো, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জিনের কোনো জায়গা নেই, এখানে শুধু লাল কালির হুকুম চলবে!”
প্রথম বিজ্ঞানীর রক্ত তখনও শুকোয়নি, কিন্তু সত্য তো আর চাপা থাকে না। কয়েক বছর যেতে না যেতেই ল্যাবরেটরির অন্ধকার কোণ থেকে আরেক তরুণ বিজ্ঞানী মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেন। তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রমাণ করে দিলেন যে, নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশ এবং হাজার হাজার বছরের সামাজিক প্রথার কারণে মানুষের জিনের মধ্যে কিছু স্থায়ী বৈশিষ্ট্য (Trait) তৈরি হয়। তিনি তথ্য–প্রমাণ দিয়ে দেখালেন যে, কেন নির্দিষ্ট কিছু যোদ্ধা গোষ্ঠীর হাড়ের গঠন বা ফুসফুসের ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়।
ব্যস! খবর পৌঁছানো মাত্রই পার্টি অফিসের করিডোরে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। সেই বৃদ্ধ কমরেড, যার চশমার কাঁচের আড়ালে বিজ্ঞানের চেয়ে ‘ইডিওলজি‘ বেশি ঝকঝক করে, তিনি ঝড়ের বেগে ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেন। বিজ্ঞানীর টেবিল থেকে ফাইলগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তিনি গগনভেদী চিৎকার করে উঠলেন:
“আবার সেই একই বিষাক্ত ষড়যন্ত্র? তবে রে নব্য–নাজি! তুই বিজ্ঞানের আড়ালে আবার সেই জার্মানির ‘ইউজেনিক্স‘ ফিরিয়ে আনতে চাইছিস? তুই বলতে চাস—একই জাতে বা একই গোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে (Endogamy) করার ফলেই নাকি এই তথাকথিত ‘উন্নত জিন‘ তৈরি হয়েছে? তুই কি জানিস না, তোর এই থিওরি সরাসরি সেই আর্য–রক্তের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলে?”
বিজ্ঞানী শান্তভাবে বললেন, “কমরেড, এটি তো সিলেক্টিভ ব্রিডিং–এর প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। প্রকৃতি এভাবেই কাজ করে…”
কথার মাঝখানেই কমরেড হুংকার দিয়ে উঠলেন, “চোপ! প্রকৃতি কীভাবে কাজ করবে সেটা পার্টি ঠিক করবে, তোর ডিএনএ নয়! তুই কি জানিস না, তোর এই তত্ত্বের পিঠে হাত বুলিয়ে গিয়েছিল ওই পাগল দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিটসে? সে বলেছিল—‘মনুর জাতি ব্যবস্থা আসলে প্রাকৃতিক‘। তুই কি তাহলে বলতে চাস ভারতের ওই প্রাচীন বামুনদের মনুস্মৃতিই ঠিক ছিল? তারা যে এক জাতে বিয়ের কথা বলেছিল, তাকে তুই আজ জিনের মোড়কে বৈজ্ঞানিক বৈধতা দিচ্ছিস?”
কমরেড কাঁপতে থাকা আঙুলে ফাইলগুলো দেখিয়ে বললেন, “তোর এই রিসার্চের প্রতিটা পাতায় মনুবাদ আর ফ্যাসিবাদ চুইয়ে পড়ছে। তোরা চাস মানুষে–মানুষে জন্মগত ভেদাভেদ তৈরি করতে, যাতে আমাদের ‘শ্রেণিহীন সমাজ‘-এর স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়। মনে রাখবি, বামপন্থার স্লেটে সবাই সাদা; সেখানে জিনের কোনো কালো দাগ আমরা সহ্য করব না!”
সেদিন বিকেলেই সেই তরুণ বিজ্ঞানীকেও ‘জনগণের শত্রু‘ এবং ‘নব্য–নাজি‘ তকমা দিয়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হলো। গুলির শব্দে যখন তার প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছিল, তখন কমরেড বিড়বিড় করে বলছিলেন, “জেনেটিক্স হলো বুর্জোয়াদের সেই শয়তানি চশমা, যা দিয়ে তারা মানুষের সাম্যকে অস্বীকার করতে চায়। আজ আমরা সেই চশমাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলাম।“
এর মধ্যেই পদার্থবিদ্যা বিভাগের এক প্রবীণ অধ্যাপক কাঁপতে কাঁপতে টেবিলের ওপর কিছু গাণিতিক সমীকরণ আর মহাকাশের দূরবীনে ধরা পড়া কিছু ছবি সাজিয়ে রাখলেন।
ব্যস! খবর পাওয়া মাত্রই প্রধান কমরেড তাঁর ভারী বুট মচমচিয়ে ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেন। তাঁর চোখে তখন বিজ্ঞানের চেয়ে ‘পার্টি ইডিওলজি‘ বেশি ঝকঝক করছে। টেবিলের ওপর রাখা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের খসড়া আর বিগ ব্যাঙের গ্রাফগুলো এক ঝটকায় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তিনি গগনভেদী চিৎকার করে উঠলেন:
“এসব কী ছাইভস্ম দেখছি? বিগ ব্যাঙ? মহাবিশ্বের নাকি একটা ‘শুরু‘ আছে? এই চক্রান্তের মানে কী, প্রফেসর? আপনি কি বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে আবার সেই ভ্যাটিকান সিটির খ্রিস্টান পাদ্রিদের ‘ঈশ্বর‘ নামক ভূতটাকে ফিরিয়ে আনতে চান?”
অধ্যাপক চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, “কিন্তু কমরেড, আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি এবং গ্যালাক্সিদের দূরে সরে যাওয়া তো গণিত আর পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণিত…”
কথার মাঝখানেই টেবিল চাপড়ে কমরেড হুংকার ছাড়লেন, “চোপ! আপনার বুর্জোয়া গণিত দিয়ে পার্টি চলবে না! আমাদের মহান কার্ল মার্ক্সের ডায়ালেক্টিক্যাল মেটেরিয়ালিজম (দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ) বলে—এই মহাবিশ্ব অনাদি এবং অনন্ত। এর কোনো শুরুও নেই, শেষও নেই। বস্তু চিরকাল ছিল আর চিরকাল থাকবে। আর আপনার এই ‘বিগ ব্যাঙ‘ তত্ত্ব বলছে মহাবিশ্বের একটা নির্দিষ্ট জন্মমুহূর্ত আছে! জন্মমুহূর্ত থাকা মানেই তো পরোক্ষভাবে সৃষ্টি কর্তাকে মেনে নেওয়া! এ তো ঘোর মনুবাদ আর ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা! আপনি ছদ্মবেশী বুর্জোয়া দালাল!”
পদার্থবিদ্যা বিভাগের সেই প্রবীণ প্রফেসরের গাণিতিক সমীকরণ আর বিগ ব্যাঙের গ্রাফগুলো যখন প্রধান কমরেড বুটের তলায় পিষে দিলেন, তখন আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। প্রফেসরকে যখন লাল বাহিনীর ক্যাডাররা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন যাওয়ার আগে প্রধান কমরেড ঘরের দেয়ালে টানানো লাল পতাকার দিকে তাকিয়ে এক ঐতিহাসিক হুংকার ছাড়লেন:
“কমরেডগণ! মনে রাখবেন, এই লেখাপড়া, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর শহরের বিলাসিতাই হলো যত নষ্টের গোড়া! এসবই আসলে মনুবাদের আধুনিক সংস্করণ, যা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করে! আমাদের ফিরে যেতে হবে একেবারে শুরুতে। আমাদের পার্টি ক্লাসে বারবার কী শেখানো হয়? মনে নেই? পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সমাজ কোনটা ছিল? আদিম সমাজ! কারণ আদিম মানুষই ছিল আসল কমিউনিস্ট! তাদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, কোনো টাকা–পয়সা ছিল না, কোনো কলকারখানা বা প্রযুক্তির বুর্জোয়া বিলাসিতাও ছিল না! তাই আমাদের সভ্যতাকে আবার সেই আদিম যুগে, সেই পরম পবিত্র শূন্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে!”
কমরেডের মুখে এই “আদিম মানুষ কমিউনিস্ট ছিল“-র তত্ত্ব এর আগে আমরা পার্টি অফিসে কতবার যে চা খেতে খেতে শুনেছি, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সেই থিওরি যে আমাদের চপের দোকান আর আস্ত জীবনটাকে এভাবে গিলে খাবে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি।
পরদিন সকাল হতেই জারি হলো এক নতুন তুঘলকি ফরমান। কমরেডদের হুকুম—শহরে কোনো চপের দোকান থাকবে না, কোনো কলকারখানা থাকবে না, এমনকি কোনো টাকা–পয়সার লেনদেনও চলবে না। আমাদের মতো লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে বন্দুকের মুখে ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। আমাদের বলা হলো, “যাও, গ্রামে গিয়ে মাঠে ধান চাষ করো! ওটাই আসল আদিম সাম্যবাদ!” কোনো প্রস্তুতি ছাড়া, মাথার ওপর ছাদ ছাড়া, না খেতে পেয়ে আর কলেরায় ভুগে আমার চেনা কত মানুষ যে পথের ধুলোয় মরে পড়ে রইল, তার কোনো হিসাব নেই।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিভীষিকা অপেক্ষা করছিল বাজারের মোড়ে। একদিন সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ দেখলাম লাল বাহিনীর ক্যাডাররা বেছে বেছে কিছু মানুষকে লাইন থেকে টেনে বের করছে। তাদের অপরাধ কী? কোনো অপরাধ নেই, শুধু তাদের চোখে চশমা পরা ছিল!
কমরেডরা হুংকার দিয়ে উঠলেন, “এই চশমা পরা লোকগুলোই হলো শিক্ষিত বুর্জোয়া! এরা বই পড়ে, বিজ্ঞান চর্চা করে বাস্তব বুদ্ধি খাটাতে চায়! এরা আমাদের আদিম সাম্যবাদী বিপ্লবের শত্রু!”
আমার চোখের সামনে, স্রেফ চোখে একটা চশমা থাকার অপরাধে কত চেনা শিক্ষক, ক্লার্ক আর সাধারণ মানুষকে “শিক্ষিত” বা “শহুরে শোষক” তকমা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। মানুষের তৈরি করা সভ্যতাকে জোর করে আদিম যুগে ঠেলে দেওয়ার এই উন্মাদনার নাম যে ইতিহাসে ‘কিলিং ফিল্ডস‘ (Killing Fields), তা আমি তখন জানতাম না।
আসলে আদর্শ বামপন্থা হলো এমন এক চশমা, যা পরলে আপনি সবার ঘরে আলো দেখতে পাবেন না, বরং দেখবেন অন্ধকারটা সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
•আমার এই গল্পটি এবং এর চরিত্রগুলো কাল্পনিক মনে হলেও, এর পেছনে থাকা প্রতিটি অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক ঘটনা ইতিহাসের নির্মম বাস্তব থেকে নেওয়া। নিচে তার কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণ দেওয়া হলো:
১. লাইসেঙ্কোবাদ ও বিজ্ঞানীদের হত্যা: সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের আমলে জিনতত্ত্ব বা জেনেটিক্সকে ‘বুর্জোয়া অপবিজ্ঞান‘ বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নিকোলাই ভাভিলভের মতো বহু বিশ্বখ্যাত জিনবিজ্ঞানীকে কারারুদ্ধ বা হত্যা করা হয়েছিল, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘Lysenkoism’ (লাইসেঙ্কোবাদ) নামে পরিচিত।
২. কুলাক দমন ও চাষিদের অনীহা: ১৯৩০–এর দশকে সোভিয়েত রাশিয়ায় যেসব পরিশ্রমী কৃষক নিজের চেষ্টায় সামান্য স্বাবলম্বী বা সঞ্চয়ী হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের ‘কুলাক‘ (Kulak) আখ্যা দিয়ে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয় এবং লক্ষ লক্ষ চাষিকে সাইবেরিয়ার লেবার ক্যাম্পে (Gulag) পাঠানো হয়।
৩. মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ: শ্রমের সঠিক মূল্য না পাওয়া এবং অবৈজ্ঞানিক জোরপূর্বক কৃষিনীতির কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘হলডোমোর‘ (Holodomor) এবং চীনের মাও সে তুং–এর আমলের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড‘ (Great Leap Forward)-এ কোটি কোটি মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যান।
৪. বিগ ব্যাঙ ও সাইবারনেটিক্স বিরোধিতা: সোভিয়েত ইউনিয়নে দীর্ঘ সময় ধরে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ, বিগ ব্যাঙ তত্ত্ব এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বা সাইবেরনেটিক্সকে ‘মার্ক্সবাদী বস্তুবাদ‘-এর পরিপন্থী বা ‘বুর্জোয়া ষড়যন্ত্র‘ বলে সেন্সর ও দমন করা হয়েছিল।
৫. একই ছাঁচের ধূসর বাড়ি (আর্কিটেকচারাল ইউনিফর্মিটি): সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্ট্যালিন এবং পরবর্তীকালে নিকিতা ক্রুশ্চেভের আমলে ব্যক্তিগত রুচি ও শৌখিনতাকে ‘বুর্জোয়া বিলাসিতা‘ বলে গণ্য করা হতো। রাষ্ট্রের নির্দেশে কোটি কোটি মানুষের জন্য হুবহু একই রকম দেখতে, ধূসর রঙের, চারকোনা কংক্রিটের সস্তা ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করা হয় (যা ‘ক্রুশ্চেভকা‘ নামে পরিচিত)। মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সৃজনশীলতা মুছে দিতে শহরের পর শহর একই রকম ছাঁচে ঢালাই করা হয়েছিল।
৬. নমেনক্লাতুরা (Nomenklatura) বা কমরেডদের বিলাসিতা: সোভিয়েত ইউনিয়নে মুখে সমতার কথা বলা হলেও কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপদস্থ নেতাদের (যাদের ‘নমেনক্লাতুরা‘ বলা হতো) জন্য বিশেষ গোপন দোকান, বিলাসবহুল বাংলো (Dacha) এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা সব সুযোগ–সুবিধা সংরক্ষিত থাকত।
৭.পল পট ও কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডস: ১৯৭৫–৭৯ সালের মধ্যে কম্বোডিয়ার কমিউনিস্ট একনায়ক পল পট ‘আদিম সাম্যবাদে‘র খোঁজে জোরপূর্বক শহর খালি করে মানুষকে গ্রামে পাঠান। বুদ্ধিজীবী এবং চশমা পরা মানুষদের “শ্রেণি শত্রু” হিসেবে চিহ্নিত করে নির্বিচারে হত্যা করা হয়, যাতে দেশের এক–চতুর্থাংশ মানুষ প্রাণ হারান।
সপ্তর্ষি পাহাড়ী
আরও পড়ুন : মার্ক্সবাদ ও রামরাজ্য