বৃত্তাকার এবং বক্রাকার বস্তুর বিভিন্ন পরিমাপের ক্ষেত্রে π এর ব্যবহার হয়ে থাকে। হিসেব নিকেশে একাডেমিকভাবে π এর একটি নির্দিষ্ট মান ব্যবহার করা হয়। যদিও পাই এর মান অসীম কিন্তু বর্তমানে ৩.১৪১৬ মানটি হিসেবের সময় অধিক ব্যবহৃত হয়। তবে এই নির্দিষ্ট মান ব্যবহার প্রচলনের ক্ষেত্রেও রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। (PI Value Indian)
প্রাচীনকালে বিশেষ করে বৃত্ত বা বক্রকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের প্রয়োজনেই π বা এর সমতুল্য মান ব্যবহার করা হত। π এর মানের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ব্যবিলনীয় মাটির ফলকে (Babylonian tablet, 1900-1680BC) এবং মিশরের রাইন্ড প্যাপিরাসে (Rhind Papyrus, ca. 1650 BC)। ব্যবিলনীয়রা -এর মান ধরেছিল ৩.১২৫ (২৫/৮), আর মিশরীয়রা ধরেছিল প্রায় ৩.১৬০৫ (২৫৬/৮১)। ভারতবর্ষে জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করা হতো মূলত অগ্নিপূজার জন্য কিংবা যজ্ঞের জন্য ব্যবহৃত যজ্ঞকুণ্ড তৈরি করতে। ASI রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০০ বছর বা তার পূর্বের যজ্ঞ কুণ্ড পাওয়া যায়, এমনকি সেসব কুণ্ডে পশুর হাড়ও পাওয়া যায়। এর ভিত্তিতে গবেষকগণ দাবি করেন – ওগুলোই মূলত বৈদিক যজ্ঞকুণ্ড বা যজ্ঞবেদী ছিল; মূলত বেদ ও বেদের যজ্ঞ বিষয়ক গ্রন্থগুলো পরে লেখা হয়েছে বলে মানা হলেও সংস্কৃতি যে আরো পূর্ব থেকেই চলমান ছিল সেটা অনেকেরই ধারণা। আমার মতে, মিশর ও ব্যাবিলনের মতই পূর্বের ভারতবর্ষেও প্রয়োজনের তাগিদেই জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা সমানতালে হত (এমনকি আরো পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল বলেও গবেষকদের মত পাওয়া যায়) এবং সেটা নিয়ে যেন প্রশ্ন না উঠে তাই যজ্ঞ বেদীর বিষয়টা সংক্ষেপে বললাম।
প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বের বৌধায়ন শুল্বসূত্রের সূত্র থেকে π এর মান (PI Value Indian) বের করা সম্ভব (যদিও সরাসরি বের করা হয়নি), বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় নিয়ে বলা আছে –
চতুরস্ত্রং মণ্ডলং চিকীর্ষন্নক্ষ্ণয়ার্ধং মধ্যাৎপ্রাচীমভ্যাপাতয়েদ্যদতিশিষ্যতে তস্য সহতৃতীয়েন মণ্ডলং পরিলিখেৎ (বৌধায়ন শুল্বসূত্র – ১/৫৮)
অর্থ: বর্গের সমক্ষেত্রফলবিশিষ্ট বৃত্ত আঁকতে হলে, কর্ণের অর্ধেক দৈর্ঘ্যের সমান একটি দড়ি বর্গের মধ্যবিন্দু থেকে পূর্বদিকের রেখার উপর স্থাপন করতে হবে। তারপর সেই দড়ির যে অংশটি পার্শ্বের বাইরে বেরিয়ে থাকে, তার এক-তৃতীয়াংশ অংশ নিয়ে (সে পরিমাণকে ত্রিজ্যা করে) একটি বৃত্ত অঙ্কন করতে হবে।
এছাড়াও, একই বিষয় মানব শু. সূ. ১০/১/১/৮ ও ১০/৩/২/১০ এও রয়েছে। শুল্বসূত্রগুলোতে বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের জন্য অন্য আরেক প্রকার পদ্ধতিও রয়েছে (এক্ষেত্রে, একটি অনুপাতের হিসে দেখানো হয় – বর্গের বাহু : বৃত্তের বাহু = ১৩ : ১৫)। ‘মহর্ষি সন্দীপনি রাষ্ট্রীয় বেদবিদ্যা প্রতিষ্ঠান’ হতে প্রকাশিত চার শুল্বসূত্রের প্রস্তাবনা অংশে শুল্বসূত্রের সূত্র ব্যবহার করে পাই (π) এর মান বের করে দেখানো হয়েছে। এক্ষেত্রে π এর মান প্রায় ৩.০৭৮ দেখানো হয়েছে (বৌধায়ন শুল্বসূত্র – ১/৫৮ এবং অন্য শুল্ব সূত্রের হিসেবে)। আপস্তম্ব, কাত্যায়ন শুল্বসূত্রেও π এর মান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একটি সূত্র অনুযায়ী, মানব শুল্বসূত্রের (মানব শু. সূ. এর সময়কাল ৭০০ থেকে ৫০০ খ্রি. পূ.) একটি ভার্সনে π এর মান প্রায় ৩.১২৫ এর সমান বের করা যায়।
পরবর্তীতে, গ্রীক পণ্ডিত আর্কিমিডিস π এর মানের একটি সীমা ব্যাখ্যা করেন সেই সীমা ছিল – প্রায় ৩.১৪০৮ থেকে ৩.১৪২৮ পর্যন্ত। বলে রাখা ভালো π একটি গ্রীক অক্ষর। সম্ভবত একারণেই ভারতবর্ষের পুরাতন পণ্ডিতগণের গ্রন্থে এই অক্ষরের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে বর্তমানে একাডেমিকভাবে যে পাই নির্দিষ্ট মান ব্যবহার করা হয় সেটা ব্যাখ্যা করেছিলেন ভারতীয় গণিতবিদ আর্যভট্ট (সময়কাল: ৪৭৬ – ৫৫০ খ্রি.)।
চতুরধিকং শতমষ্টগুণং দ্বাষষ্টিস্তথা সহস্রাণাম্।
যুতদ্বয়বিষ্কম্ভস্য আসন্নো বৃত্তপরিণাহঃ।।
[আর্যভটিয়া, গণিতপাদ (২য় অধ্যায়) – ১০]
অনুবাদ: ১০০-এর সাথে ৪ যোগ করে, সেটিকে ৮ দিয়ে গুণ করে, এবং তার সাথে ৬২,০০০ যোগ করলে—এটাই ২০,০০০ ব্যাসবিশিষ্ট একটি বৃত্তের পরিধির প্রায় আনুমানিক মান।
হিসেব করলে পাই (π) এর মান দাঁড়ায় –
[{(১০০+৪) x ৮} + ৬২০০০]/২০০০০ = ৩.১৪১৬ অর্থাৎ, বর্তমানে ব্যবহৃত মান। তবে, আর্যভট্ট পাই (π) সরাসরি ব্যবহার না করলেও এই অধ্যায়েই বৃত্তের ক্ষেত্রফল ও ব্যাসার্ধ নির্ণয়ের সূত্র সর্ম্পকে লিখেছেন। পরবর্তীতে ব্রহ্মগুপ্ত (৭ম শতক) ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত গ্রন্থে, গণিতবিদ শ্রীধরাচার্যের (আনুমানিক ৮ম শতক) ত্রিশতিকা গ্রন্থে, জৈন গণিতজ্ঞ মহাবীরের (আনুমানিক ৯ম শতক) গণিতসারসংগ্রহ গ্রন্থে, ভাস্করাচার্যের (১২শ শতক) লীলাবতী গ্রন্থেও পাই এর মান নিয়ে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তবে, মানগুলোর মধ্যে আংশিক পার্থক্য লক্ষিত হয়।
বৃত্তব্যাসস্য কৃতর্মূলং পরিধির্ভবতি দশগুণায়ঃ। ব্যাসার্ধবর্গবর্গাৎ ক্ষেত্রফলং দশগুণান্ মূলঃ।।
(ত্রিশতিকা ৪৫)
অনুবাদ: বৃত্তের ব্যাসের বর্গকে ১০ দ্বারা গুণ করলে তার বর্গমূল হয় পরিধি। ব্যাসার্ধের বর্গের বর্গকে দশগুণ করে তার বর্গমূল করলে বৃত্তের ক্ষেত্রফল প্রাপ্ত হয়।

অর্থাৎ, এক্ষেত্রে ✓১০ এর সমপর্যায়ের মানই মূলত π এর মান হিসেবে বর্ণিত হচ্ছে। এই মানটাই একটু অন্যভাবে ব্রহ্মগুপ্ত উনার ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত গ্রন্থের দ্বাদশ অধ্যায় (গণিতাধ্যায়) এর ৪০ নং সূত্রে বর্ণনা করেছেন, এক্ষেত্রেও ✓১০ এর মান হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। আরো পরবর্তীতে সঙ্গমগ্রামার মাধব (১৩৪০–১৪২৫ খ্রি.) বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম অসীম ধারা বা ইনফিনিট সিরিজ ব্যবহার করে পাই (π)-এর মান নির্ণয় করেন। তারপর আরো অনেকেই π এর মান নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তন্মধ্যে, ভারতবর্ষীয় শ্রীনিবাস রামানুজন পাই (π)-এর মান অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে নির্ণয় করার জন্য বেশ কিছু গাণিতিক সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯১৪ সালে তিনি এমন ১৭টি সূত্র প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন : বাঙালির প্রথম গণ অভ্যুত্থানের বিস্মৃত আখ্যান
প্রাচীনত্বকে প্রাধান্য দিয়ে যতটুক সম্ভব সংক্ষেপে পাই (π) এর মানের ইতিহাস নিয়ে ব্যাখ্যা করলাম। আপনাদের আগ্রহ থাকলে আরো বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ সহ পরবর্তীতে কখনো এ নিয়ে লিখব।
✍️উচ্ছ্বাস তালুকদার
তথ্যসূত্র:
১) Memoirs of the Archaeological Survey of India No. 110 – Excavations At Kalibangan The Harappans (1960-69) Part I
২) চার শুল্বসূত্র -মহর্ষি সন্দীপনি রাষ্ট্রীয় বেদবিদ্যা প্রতিষ্ঠান (হিন্দি)
৩) Aryabhatiya of Aryabhata – Indian National Science Academy New Delhi
৪) শ্রীধরাচার্যবিরচিত ত্রিশতিকা – প্রো. ভি. কুটুম্বশাস্ত্রী
৫) ব্রহ্মগুপ্ত রচিত ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত – ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যান্ড সংস্কৃত রিসার্চ, নিউ দিল্লি (সংস্কৃত-হিন্দি)
৬) R. C. Gupta, New Indian Values of π from the Mānava Śulba Sūtra, Centaurus, Vol. 31, 1988
৭) বিভিন্ন আন্তর্জাল সূত্র