বাংলা ভাগের অনেক আগে থেকেই ভারতের বিশেষত বাংলার সদ্য তরুণ যুবকরা ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এক সময়ে তারা ছিল বিচ্ছিন্ন। তাদের উদ্দেশ্য, অভিমুখ ও কর্মপ্রণালী আলাদা আলাদা ছিল। এ ছাড়া ছিল তাদের অহংবোধ। প্রত্যেকেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করত। কারো সঙ্গে কারো যোগাযোগ ছিল না। মূল সমস্যা ছিল কীভাবে এই স্বাধীনতা আন্দোলন কার্যকর করা যাবে সেই পদ্ধতি নিয়ে। (ব্রিটিশরাজ বনাম বাঘাযতীন)
লেখক এটা ঠিক বলেননি যে অগ্নিযুগের সূচনা হয়েছিল মহারাষ্ট্রে। চাপেকার ভাইরা র্যান্ড ও তার সহযোগীকে খুন করেছিল ওদের কুসংস্কারের জন্য, র্যান্ড ছিলেন প্লেগ কমিশনার; তিনি প্লেগ রোখার ও মৃত্যুহার কমানোর জন্য যা করেছিলেন তার জন্য তাঁর সাধুবাদ প্রাপ্য। ফল হল উল্টো। তিনি ঘরে ঘরে ঢুকে বিছানা কম্বল, লেপ, তোষক পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইউরোপীয়রা প্লেগ সম্পর্কে আমাদের থেকে বেশি জ্ঞানসম্পন্ন। র্যান্ড সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু ওখানকার হিন্দু মুসলমান সকলেরই রাগ কেন তিনি মেয়েদের অন্দরমহলে ঢুকবেন। তারই প্রতিশোধ নিতে চাপেকার ভাইরা র্যান্ডকে খুন করেছিল। ক্ষুদিরাম বসুই প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী যাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
শুরুতে কিছু সরলপ্রাণ দেশপ্রেমী মানুষ ভেবেছিল যে মাঝে মাঝে কিছু শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক আধিকারিককে হত্যা করলেই ব্রিটিশ প্রশাসন ভেঙে পড়বে এবং ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রথম এই খণ্ড বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর কর্মপন্থা ঠিক করলেন। তিনি বললেন যে এইভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলে হবে না। তিনি বললেন যে ব্যক্তিহত্যা বিশেষ প্রয়োজনীয় হলে করতে হবে কিন্তু মূল উদ্দেশ্য হবে সামগ্রিক অভ্যুত্থান ভারতবর্ষ জুড়ে। এর জন্য সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে ঢুকে অন্তর্ঘাত ও অভ্যুত্থান করতে হবে।
তিনি শুধু বাংলা নয় একে একটা সর্বভারতীয় আকার দিলেন। বাংলার বাইরে মহারাষ্ট্র উত্তর ও পশ্চিম ভারত, পাঞ্জাব, আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে তিনি বাংলা থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়ে সেখানে বিপ্লবের জন্য সব রকম প্রস্তুতি চালাতে ব্যবস্থা নিলেন। ব্যায়াম, কুস্তি, লাঠি তরোয়াল চালানো, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার এইসবের ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে পুলিশের নজর এড়াতে বজ্রকঠিন গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হয়েছিল। তাঁরা বিভিন্ন ব্যবসা ও ক্লাবের নামে তার পিছনের অংশে এই সব কর্মকাণ্ড চালাতেন।
দ্বিতীয়ত ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এত বিপুল কর্মোদ্যোগ চালানো সম্ভব ছিল না। তিনি ও তাঁর বিপ্লবী সতীর্থরা বহির্ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। সুযোগ্য প্রতিনিধি পাঠিয়ে সেখানকার ব্রিটিশ বিরোধী সরকারের কাছে অস্ত্র ও অর্থসাহায্য চাওয়া হয়েছিল। যে দেশ ভারতের বিপ্লবীদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল সেই দেশটা হল জার্মানি। জাপান পরে এসেছিল তবে সেটা সম্ভব হয়েছিল রাসবিহারী বসুর জাপানে অন্তর্ধানের পরে। আরো যে সব দেশে জাল বিস্তার করা হয়েছিল সেগুলো হল আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেন। এদিকে এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল সাংহাই, পেনাং, বর্মা, বাটাভিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয় পর্যন্ত বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জাল ছড়িয়ে পড়েছিল । এসবের কাণ্ডারী ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বা বাঘা যতীন।
জার্মানি থেকে মাভেরিক জাহাজে মাঝ সমুদ্র অস্ত্র নামানো হবে লার্সেন জাহাজ থেকে। জনৈক দুমুখো চর ভোস্কা সেই গোপন খবর চালান করে ব্রিটিশ সরকারকে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা সেই লার্সেনকে আটক করলে সব অস্ত্র পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়।

গুপ্ত সূত্রে খবর পেয়ে যতীন ও তার চার সঙ্গী চাঁদিপুরের কাছে কপ্তিপোদায় গোপন আস্তানা গাড়েন। ব্রিটিশ সরকারের জেলা শাসক ও সার্জেন্ট যথাক্রমে কিলবি ও রাদারফোর্ড বিশাল বাহিনী নিয়ে পাঁচ জনের দলকে ঘিরে ফেলেন। মাত্র তিনশ কার্তুজ নিয়ে এই পাঁচজন ব্রিটিশের শক্তিশালী বাহিনীর সঙ্গে এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট দুর্ধর্ষ লড়াই করেন। তারিখটা ছিল ৯ই সেপ্টেম্বর, ১৯১৫ চিত্তপ্রিয় ঘটনাস্থলেই মারা যান। যতীন ও জ্যোতিষ গুরুতর আহত হন। বাকি দুইজন নীরেন ও মনোরঞ্জন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যতীন পরের দিন হাসপাতালে মারা যান। বিচারে নীরেন ও মনোরঞ্জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় ও জ্যোতিষকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি জেলেই উন্মাদ হয়ে মারা যান।
যতীন্দ্রনাথ যে বিপুল কর্মোদ্যোগ নিয়েছিলেন তা মহাকাব্যিক স্তরের। যদি ঐ জাহাজ এসে পৌঁছত তবে ঐ সময় নাগাদ ভারতের স্বাধীনতা আসত। গান্ধিজিকে লোকে চিনতই না।
যতীনের পরে রাসবিহারী ও তারপর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সেই ধারায় আইএনএ সংগঠিত করে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়েছিলেন তার ফলেই ভারতের স্বাধীনতা ত্বরাণ্বিত হয়েছিল। এখন সেই বিষয়টা ইতিহাস নিশ্চিত করেছে।
যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের অসাধারণ শারীরিক শক্তি, তাঁর দেশপ্রেম, চাতুর্য ও বিস্তৃত পরিকল্পনা তাঁকে প্রথম সর্বভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে ইতিহাসকে সেই দিকে চালনা করতে হবে।
আলোচ্য বইটি তার উদ্দেশ্য পূর্ণ করেছে। এই গ্রন্থের বিপুল সাফল্য কামনা করি।
সুদীপনারায়ণ ঘোষ
১৪/০৮/২০২৬
বইটা কেনা যাবে এই লিঙ্ক থেকে।
আরও পড়ুন: Book Review : Hindu Genocide, Sexual Violence and Forced Conversion by Dr Rinita Mazumdar