Thursday, March 5, 2026
HomeArticlesResearch & Scholarlyবহ্ন্যুৎসবের পরে দোল

বহ্ন্যুৎসবের পরে দোল

“ফাগুনে আগুন/চৈতে মাটি/বাঁশ বলে শীঘ্র উঠি।” গ্রাম বাংলার একটি পরিচিত কৃত্য হল বাঁশ বাগানের মেঝেতে ফাগুনমাসের সন্ধ্যায় অগ্নিসংযোগ। শীতকাল জুড়ে বাঁশঝাড়ের তলায় পুরু হয়ে জমে ওঠে পাতার রাশি। বাঁশবাগানে হাঁটলে পা গভীরে দেবে যায়। বড়রা বলেন, “ওদিকে যাস নে, চন্দ্রবোড়া সাপের আস্তানা।” বাঁশঝাড় পিট-ভাইপারের পছন্দের জায়গা। দুঃসাহসী ছেলের দল কিন্তু নিষেধ মানে না, বাঁশবাগানে অকুতোভয়ে খেলে বেড়ায়। এদিকে প্রতি বছর ফাগুনে আগুন জ্বালানোর বন্দোবস্ত করে সাপের চিরস্থায়ী বাসা ভাঙা হয়। বসন্ত ঋতুতে গ্রামাঞ্চলে সন্ধ্যা নামলেই দাউদাউ জ্বলে ওঠে এক একটি বাগান। বাঁশঝাড়ে পটাশ সারের চাহিদা এতে মেটে, বলে থাকে লোকসমাজ। বলে বাঁশ পটাশ-প্রিয় গাছ। ঝাড়ে পটাশের চাহিদা মেটাবে কে? ইকোসিস্টেমে বর্ষাকালে পাতাপচে আপনা থেকেই সার হয়। বসন্তে পাতা পুড়িয়ে দিলে সারের যোগান হয়। তারপর আশপাশ থেকে এক কোদাল, দুই কোদাল মাটি তুলে দেওয়া হয় ছাইয়ের উপরে বাঁশের গোঁড়োর গোঁড়ায়। বাঁশগাছ দেখতে দেখতে তাগড়াই হয়ে ওঠে বর্ষার জলে। এটা বাগানীদের লোকজ্ঞান। খনার বচনে এভাবেই বাঁশঝাড় পরিচর্যার কথা আছে। (dolotsav)

দোলপূর্ণিমার আগের সন্ধ্যায় ‘চাঁচর’ বা ‘ন্যাড়াপোড়া’ নামে এক বহ্ন্যুৎসব আয়োজিত হয়। গ্রাম ও শহরতলীর কিশোর কিশোরীদের দারুণ অংশগ্রহণ ছিল একসময়। কোনো কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও আয়োজিত হয় এই উৎসব। এক বাসন্তী সান্ধ্য-কৃত্যের প্রাচীন ধারাবাহিকতা। আজ এ বাগান, কাল সে বাগানে আগুন জ্বলে। বাগানের নিচের ঘাস পুড়তে থাকে। বাঁশবাগানে আগুন দেওয়া হয়। কঞ্চি-বাঁশ পুড়ে যায় তলায় রাশি রাশি শুকনো পাতা। তবে গৃহস্থ সজাগ থাকেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে পুকুরের জল ব্যবহৃত হয়।(dolotsav)

ছোটোবেলায় দোলের আগের দিন ন্যাড়াপোড়া করতাম। সেদিন পাড়ার অনেক দিদা-ঠাকুমারা কাঁদতেন। অনেকেই পূর্ব পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। চোখের সামনেই তাদের খড়ের বাড়ি, দড়মার বেড়া, শোবার ঘর পুড়িয়ে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।  বীভৎস ধর্মীয় আক্রমণ হয়েছে। ছিন্নমূল উদ্বাস্তু রমণীরা আরও একপ্রস্ত কেঁদে নেন, নীরবে এবং লুকিয়ে। এর কি কোনো ফাইল প্রকাশিত হবে? কোনো চলচ্চিত্র!

dolotsav
dolotsav

বাঁশপাতা আর কঞ্চি সাজিয়ে ‘বুড়ির ঘর’ তৈরি হয়ে যায়। লাগে শুকনো নারকেলের পাতা, সুপারির পাতার খোল, আম-জাম-পেয়ারার শুকনো পাতা শুকনো কচুরিপানার স্তূপ। নেড়াপোড়ার বহ্নিসজ্জাকে পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। এই পাহারা দুর্বলচিত্তের কাজ নয়। পাড়ার দুষ্টছেলেরা চুরি করে অন্যের চাঁচর জ্বালিয়ে দেয়। জোর করে চাঁচর জ্বালানো নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় অশান্তি হয়৷

চাঁচর জ্বলছে। ক্যাম্প-ফায়ারের মতো তার চারপাশে গোল হয়ে কিশোরেরা দাঁড়িয়ে আছে। পূর্ণিমার চাঁদ আরও উজ্জ্বল, আরও মোহময় হয়ে উঠছে। হাততালি দিয়ে ছড়া কাটছে সবাই, “আজ আমাদের নেড়াপোড়া/কাল আমাদের দোল/পূর্ণিমার ওই চাঁদ উঠছে/বলো হরি বোল।” সমবেত কণ্ঠে বলে “হরি বোল। হরি বোল।” হরিনামের মাধুর্যে কিশোর কিশোরীর অন্তঃকরণে আবেগ-উদ্বেলতা। আগুনের আলো, পুবের পূর্ণশশী মিলিয়ে অসামান্য পরিবেশ! পরের দিন দোল।

নেড়াপোড়া হবার আগেই আমরা বালতি করে জল রেডি রাখতাম। শেষে বাঁশ পিটিয়ে, জল দিয়ে আগুন পুরোপুরি নিবিয়ে দেওয়া হতো। আর খোঁজা হত মাটির হাড়িতে রাখা আলু-রাঙাআলু-কচু-খামালু পোড়া। পোড়া সব্জি খোসা ছাড়িয়ে সৈন্ধব লবণ, লঙ্কা আর সরষের তেলে মেখে সমবেতভাবে খাওয়া হতো৷ পরদিন পাড়ার গরীব মানুষেরা ন্যাড়াপোড়া-স্থল থেকে সংগ্রহ করতে আসতেন আধপোড়া কাঠকয়লা। আমরাও আসতাম রঙ ফুরিয়ে গেলে কালি-ভূষো বানানোর জন্য ছাই সংগ্রহ করতে।

দোল ও হোলি রঙের উৎসব। আলোর উৎসব যেমন আছে ‘দীপাবলী’, ফসলের উৎসব আছে ‘নবান্ন’, অবগাহনের উৎসব আছে ‘কুম্ভস্নান’। হিন্দুধর্মের বহুমুখী বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেছে এইসব উৎসব। দোলপূর্ণিমা ও হোলিখেলাকে কেন্দ্র করে সারা ভারত জুড়ে রঙের উৎসব চলে। উৎসবের প্রেরণা হচ্ছে বাসন্তী-প্রকৃতিতে রঙের মোহনা, কিশলয় ও পুষ্পপল্লবের অনুপম সৌকর্য। প্রকৃতির রঙের অনুকরণে মানুষও সাজতে চায়, মানুষ তার প্রিয়জনকে সাজাতে চায়।
“তোমায় সাজাব যতনে কুসুমে রতনে
কেয়ূরে কঙ্কণে কুঙ্কুমে চন্দনে।।
কুন্তলে বেষ্টিব স্বর্ণজালিকা, কণ্ঠে দোলাইব মুক্তামালিকা,
সীমন্তে সিন্দুর অরুণ বিন্দুর– চরণ রঞ্জিব অলক্ত-অঙ্কনে।।”
প্রাকৃতিকভাবে দোল উৎসব পালন করতে হলে ভেষজ আবীর চাই। কোথায় পাবো? নিজেরাই তৈরি করে নিতে পারি ঘরোয়া পদ্ধতিতে। চার-পাঁচ দশক আগে আমরা ছেটোরা বাড়িতে ভেষজ আবীর বানিয়েছি। অভাবের সংসারে ওটুকু রঙ-আবীর সংগ্রহ করাও তখন কঠিন হয়ে পড়তো। সরস্বতী পূজায় কাঁচা হলুদ, নিম, মুসুরি ভেজানো বাটা, তেল মিশিয়ে সারা গায়ে মেখে স্নান করতে যেতাম। তখনই আইডিয়া হল, হলুদ-বাটা বেশ মানানসই রঙ হতে পারে। বেটে নিতাম শ্বেত চন্দন আর রক্ত চন্দন। তাতে রঙ সুগন্ধি হয়। নানান রঙের গাঁদার পাপড়ি বেটে নিতাম। জোগাড় করে নিতাম নীলকণ্ঠ ফুল, পলাশ। পাপড়ির মণ্ডে আঠালোভাব আনতে তরি-তরকারির খোসা আঠা হয়ে উঠতো। ঝিঙে, পটল, লাউ, শশা ইত্যাদির বোঁটার দিকটি কেটে নিলেই আঠা বেরিয়ে আসতো। চামচ দিয়ে চেঁচে নিতাম। একটি থালার মাঝে রেকাবিতে রাখা থাকতো সামান্য আবীর। বাকী ছোটো ছোটো গোল বাটিতে উদ্ভিদ-মণ্ড সাজিয়ে নিয়ে দোল খেলতে বেরোতাম। দুষ্ট ছেলেরা হাসে৷ তবে পাড়ার দিদিরা নিজেরাই এসে মেখে নেন ভেষজ আবীর, চট করে পাওয়া যেতো না তখন এসব প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি জিনিস, কারণ খাটতে হয়। দিদিরা আমাদেরই রঙ নিয়ে আমাদেরই গালেও বেশ করে মাখিয়ে দিতেন। “এই যা! রূপচর্চা হয়ে গেলো! এরপর কেউ বাঁদর রঙ তোদের মাখাতে আসুক! তা এই মণ্ডের উপরেই তো পড়বে। তোদের চামড়ার ক্ষতি হবে না।” রঙের উৎসবে, দোল-হোলির দিন আমরা সবাই উদ্ভিজ্জ উপাদান ব্যবহার করে প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পারি।

একসময় ফাল্গুনি পূর্ণিমার তিথিতে নববর্ষ উৎযাপিত হত। দোলযাত্রা ছিল তার ধারক ও বাহক। ফাল্গুনি পূর্ণিমার পর চৈত্র মাসকে প্রথম মাস ধরে বারোমাসের হিসেব হত। আর ওই যে আদিবাসীদের ‘বাহা পরব’; ওটাও নববর্ষ ধারণা, নব বসন্তের পুষ্প পরিণতি। তা অনুষ্ঠিত হয় ফাল্গুনি পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়ে। বসন্ত-বন্দনার মাধ্যমে নববর্ষের সূচনা বনবাসী-কৌমসমাজের প্রাচীন রীতি। ফুলের পরবে পুষ্পোপাসনার মধ্যে আগামীদিনের খাদ্যের প্রতিশ্রুতি। কারণ ফুল থেকে আসবে ফল। “ফুল কহে ফুরারিয়া, ফল, ওরে ফল,/কতদূরে রয়েছিস বল মোরে বল।/ফল কহে, মহাশয়, কেন হাঁকাহাঁকি, /তোমার অন্তরে আমি নিরন্তর থাকি।” এই যে রূপান্তরের নান্দনিকতা, এটাই খাদ্য-সংস্কৃতি। বাহা পরবে তাই শস্য পাবার আকাঙ্খা এবং তারই প্রেক্ষিতে নববর্ষকে আহ্বান। প্রকৃতির রঙ-রূপ পুষ্প-পল্লব হয়ে ধরা দেয় দোলপূর্ণিমায়, তারপর ফল হয়ে, বীজ হয়ে দেবী অন্নপূর্ণার প্রসাদ রূপে প্রাপ্ত খাদ্য আমাদের বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা নিবৃত্তি করে।

বড় হতে হতেই দেখেছি দোল-খেলা হচ্ছে বাঁদর রঙে, সোনালী বা রূপালী কৃত্রিম রঙে। পকেটে তা নিয়ে ঘুরতো কিশোর-তরুণরা। ওইসব রঙ মাখালে মুখ আর চেনার জায়গায় থাকতো না। রঙ তুলতে খুব সাধ্যসাধনা করতে হত। পুকুর ঘাটগুলি দুপুরে রঙ তোলার স্নানার্থীতে ভরে যেত। ন’য়ের দশকে বাচ্চারা বেলুনে ভরা রঙ ব্যবহার করতে শুরু করলো। পিচকারির ব্যবহার হতে লাগলো কেবল বেলুনে গোলা জল ভরতে। বিষাক্ত রঙগুলি গায়ে লাগলে জ্বলে যায়। কে শোনে কার কথা! ওই রঙ মাখতেই হবে।

ক্লাস এইটের আগে বাবা জীবিত থাকাকালীন তিনি দোলের আগের দিন বাড়িতে এনে দিতেন মাটির তৈরি রাধাকৃষ্ণ। সামান্য আবীর, ফুল-মালা, বাতাসা, ফুট কড়াই, মঠমিষ্টি। বাড়ীতে তৈরি হত মালপোয়া আর পায়েস। দোলের দিন সকালে পুজো। বাবা নিজে করতেন পুজো। পুজোর পর রাধাকৃষ্ণের পায়ে আবীর। তারপর বয়স অনুযায়ী বাবা-মা-দাদা-দিদিদের পায়ে আবীর দেওয়া হতো। বোনের কপালে দিতাম আবীরের টিপ। বাবা-মা আশীর্বাদ করে কপালে আবীর দিতেন। সামান্য হলেও সুগন্ধি ছিল সেই আবীর। ছোড়দি শ্বেতচন্দন আর রক্তচন্দন বেটে রাখতেন। চন্দনপাটায় বাসন্তী আর কমলা গাঁদাফুল বেটে নেওয়া হত। এসব দিদিরা আমাদের মুখে ভালো করে মাখিয়ে দিতেন যাতে কেমিক্যাল রঙ বাইরের কেউ মাখালেও ত্বকের ক্ষতি না হয়। তারপর আমরা সকলে ছুটে চলে যেতাম বাইরে দোল খেলতে। সকাল ন’টা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত দোল খেলতাম। অনেক বাড়িতে কাকিমা-জেঠিমার পায়ে আবীর দিলে তারা মুখে মিষ্টি আর জল ঢেলে দিতেন। এসব উঠে গেলো নয়ের দশক থেকে। এখন ফ্ল্যাট কালচারে সবাই সবার সঙ্গে মেশে না। দূরত্ব বড় হতে থাকে। ছোটোবেলায় বন্ধুদের মধ্যে আড়ি-ভাব ছিল। দোলের দিন সে সব দূর হয়ে যেত, সবার সঙ্গে তখন সদ্ভাব। দোল আমাদের কথা না বলার অভিমান দূর করতো।

পড়ুন : কৃষি দেবতা শিব

আমাদের বাসাবাড়ি ছিল খড়দহে। দোল নিয়ে যদি কিছু লেখা হয়, অবশ্যই প্রথমে আসবে দোলমঞ্চ পাড়ায় আয়োজিত দোল উৎসবের কথা। তার এক ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস আছে। খড়দহ ফেরিঘাটের কাছে প্রিয়নাথ বালিকা বিদ্যালয় এবং শ্রীগুরু গ্রন্থাশ্রমের মাঝে দোলমঞ্চ অবস্থিত। শ্যামসুন্দর মন্দিরের কাছে একটি স্থানে দোলের আগের দিন চাঁচড় অনুষ্ঠিত হয়। তখন মন্দির থেকে পালকিতে করে উপস্থিত হন শ্যামসুন্দর, শ্রীরাধিকা এবং অনন্তদেবের বিগ্রহ। চাঁচড় দেখিয়ে তাদের সেদিনের মতো মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন সকালে দেবতা আবারও আসেন দোল উপলক্ষে। ভক্তবৃন্দ রাঙিয়ে দেন বিগ্রহের পাদপদ্ম। সমবেত কণ্ঠ গেয়ে ওঠে দোলের গান। কী যে তার আকুতি, সেদিন উপস্থিত না থাকলে বোঝা যাবে না। সমস্ত দিন জুড়েই এই আনন্দমেলা চলে। রাতে ফিরিয়ে আনা হয় বিগ্রহত্রয়কে। সেখানেও একপ্রস্ত দোল খেলা চলে। দোলপর্বের শেষে রাতে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়। খড়দায় গোপীনাথজীর মন্দিরের উত্তর প্রান্তে রয়েছে বারান্দাময় এক দোলমঞ্চ। দোলযাত্রায় এখানে আনন্দের হাট। এ আনন্দের ঐশী স্বাদ।

অধ্যাপক ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

চিত্র ঋণ: স্বর্ণেন্দু দেব

দোলপূর্ণিমা

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments