Monday, May 4, 2026
HomeArticlesResearch & Scholarlyসংস্কৃত ভাষার আদি লিপি কী?

সংস্কৃত ভাষার আদি লিপি কী?

বলা হচ্ছে সংস্কৃত ভাষার জন্য দেবনাগরী লিপি গঠন করা হয় মাত্র ১০০০ বছর আগে। এর কোনো লিপি ছিল না! বলা হচ্ছে কালিদাস ব্রাহ্মী বা গুপ্ত লিপিতে লিখতেন। অনেক অনেক প্রশ্ন উঠে আসে।   গুপ্ত  লিপি  কী?  এটি  কি  ব্রাহ্মী  লিপি  থেকে  আলাদা?  ব্রাহ্মী  লিপি  কোন  ভাষার  প্রতিনিধিত্ব করত? (Oldest Script Of Sanskrit)

পাণিনির ব্যাকরণ বা পাণিনির উল্লেখিত পূর্ববর্তী ব্যাকরণগুলি কোন লিপিতে লেখা হয়েছিল?

এগুলি বর্তমান কাল থেকে  তিন  হাজার  বছর  আগে  লেখা  হয়েছিল।  মহাভারত  প্রায়  পাঁচ  হাজার  বছর  আগে  লেখা  হয়েছিল  বলে  জানা  গেছে।  কোন  লিপিতে  এটি  লেখা  হয়েছিল?  কেবল মুখস্থ করে এবং শ্রবণ করে এত বিশাল সাহিত্য আধুনিক কাল পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা সম্ভব  নয়।  কোন  লিপি  ব্যবহার  করা  হয়েছিল?  ব্রাহ্মীর  উৎপত্তিস্থল  কী?  এটি  কোন  ভাষার  বাহন ছিল? এটা কীভাবে হতে পারে যে ব্রাহ্মী বলে একটি  লিপি  ছিল  অথচ  যার  সঙ্গে  সামঞ্জস্যপূর্ণ  ভাষা  ছিল  না  আবার সংস্কৃত  এমন  একটি  উন্নত  ভাষা  ছিল  যা  বর্তমানের  আট  থেকে  দশ হাজার বছর আগে, যদি আরো আগে না হয়, উৎপন্ন হয়েছিল, অথচ তা কোনো নির্দিষ্ট লিপি ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল? (Oldest Script Of Sanskrit)

দৃঢ় সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব  বোঝায় না, যে সংস্কৃত এত সমৃদ্ধ সাহিত্য, ছন্দ, অলংকার, সঙ্গীত সহ, একটি অত্যন্ত উন্নত ভাষা তার জন্য একটা লিপি তৈরি করতে পারেনি? সম্ভব?

কেন হঠাৎ করেই নতুন লিপি, বর্তমান দেবনাগরী লিপি, তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? নয় হাজার বছর ধরে সংস্কৃত একটি অত্যন্ত উন্নত ভাষা ছিল এবং লিপি ছাড়াই ছিল? এবং প্রায় এক হাজার বছর আগে হঠাৎ  এক  সুন্দর  সকালে  একটি  নতুন  লিপি  তৈরির  সিদ্ধান্ত  নেওয়া  হয়েছিল! কে  তৈরি  করেছিল?  কেন?  কীভাবে?  এটি  কোন  লিপির  উপর  নির্ভর  করে  গড়ে উঠেছিল?  নাকি এটি স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছিল? উদ্ভাবক কারা? তাদের নাম? যদি কোনো গোষ্ঠী এটা করে তাহলে গোষ্ঠীটি কাদের নিয়ে গঠিত? গোষ্ঠীর নাম?

এখন বলা হচ্ছে যে সংস্কৃত হল সমস্ত ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার মাতৃভাষা যেমন ওড়িয়া, বাংলা,  (অসমীয়া  লিপি  প্রায়  বাংলার  অনুরূপ) ,  গুজরাটি,  পাঞ্জাবি,  তেলেগু এবং  কানাড়া  (একই  লিপি)  এবং  রাজস্থানী।  কিন্তু  তাদের  নিজস্ব  লিপি  ছিল,  সবই  আলাদা। এখানে এটা প্রায় মজার এবং আশ্চর্যজনক যে কন্যা ভাষাদের নিজস্ব লিপি ছিল কিন্তু মাতৃভাষার নিজস্ব লিপি ছিল না!!!

তাছাড়া, সমস্ত ভারতীয় ভাষার বর্ণমালা স্পষ্টভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত। স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ -অ/আ,    ক/খ,  আ-কার,  ইকার,  যুক্তাক্ষর  ইত্যাদি।  এর  অর্থ  হল  এই  সমস্ত  লিপির  একটি  সাধারণ মাতৃলিপি এবং লিখন পদ্ধতি ছিল। সেই লিপিটি কী? বর্ণমালা এবং শব্দ লেখার ব্রাহ্মী  পদ্ধতি  কী? অশোক ব্রাহ্মী লিপিতে শিলালিপি স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু সংস্কৃত  ভাষাতে।  তার মানে সংস্কৃত  ছিল  লিপিবিহীন  একটি  ভাষা এবং ব্রাহ্মী ছিল ভাষাবিহীন একটি লিপি!!

এটা কি খুব বেশি সরল শোনাচ্ছে না?

এটা কীভাবে সম্ভব যে বেদ, উপনিষদ, ব্রাহ্মণ,আরণ্যক, মহাভারত, রামায়ণ, পুরাণের মতো বিশাল সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থগুলি অক্ষত আকারে লিখিত সংস্করণ ছাড়াই এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল? তাছাড়া, অন্য কোনও সভ্যতায় স্মৃতি, শ্রুতির মতো এমন কোনও ধারণা নেই কেন? লিখিত  রেকর্ড  ছাড়া  এই  বিপুল  পরিমাণ  জ্ঞান  মনে রাখা  প্রায়  অসম্ভব।  হয়তো  এগুলো  শুকনো  পাতা, বল্কল, পোড়ামাটির মতো ক্ষয়িষ্ণু পদার্থে লেখা ছিল। প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে এগুলো  অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এবং অবশ্যই বিদেশি আক্রমণকারীদের দ্বারা ধ্বংস  হয়ে  গিয়েছিল।  এটা বলা  যায়  না  যে  সংস্কৃত  শাস্ত্র  এবং  গ্রন্থগুলি  কোনও  লিপি  ছাড়াই  আমাদের  কাছে  অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে এবং আমাদের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। সংস্কৃত ভাষার সব সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থ দেবনাগরী লিপির আগে কোন লিপিতে লিখিত হয়েছিল তা আবিষ্কার করতে হবে।

Oldest Script Of Sanskrit
Oldest Script Of Sanskrit

সংস্কৃত ভাষা কেবল একটি নির্দিষ্ট লিপির সঙ্গেই আবদ্ধ ছিল না—বরং সেই সময়ে যে অঞ্চলে যে লিপিটি অধিক প্রচলিত বা প্রভাবশালী ছিল, সংস্কৃত সেখানেই সেই লিপিতেই লেখা হত।

ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত প্রধান লিপিগুলো:

১। ব্রাহ্মী – সংস্কৃত লেখার জন্য ব্যবহৃত প্রাচীনতম লিপি; সম্রাট অশোকের শিলালিপি এবং প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থগুলোতে এই ব্রাহ্মী লিপিরই ব্যবহার দেখা যায়।

২। গুপ্ত লিপি – ব্রাহ্মী লিপি থেকেই এর উদ্ভব; গুপ্ত শাসনকালে (খ্রিস্টীয় ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ শতাব্দী) এটা ব্যবহৃত হতো। বহু ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য এই লিপিতেই রচিত হয়েছিল।

৩। সিদ্ধম / সিদ্ধমাতৃকা – খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দী পর্যন্ত এই লিপির ব্যবহার ছিল, বিশেষ করে বৌদ্ধ সংস্কৃত গ্রন্থগুলো লেখার ক্ষেত্রে। বর্তমানেও জাপানে মন্ত্র লেখার কাজে এই লিপি ব্যবহৃত হয়।

৪। শারদা – কাশ্মীর এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি লেখার জন্য এই লিপি ব্যবহৃত হতো।

৫। গ্রন্থ লিপি – দক্ষিণ ভারতে বিশেষভাবে সংস্কৃত লেখার উদ্দেশ্যেই এই লিপির উদ্ভব ঘটেছিল। যেহেতু তামিল লিপি দ্বারা সংস্কৃতের সমস্ত ধ্বনি সঠিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না, তাই ‘গ্রন্থ লিপি’ তৈরি করা হয়। বর্তমানেও তামিলনাড়ুতে সংস্কৃত লেখার জন্য এই লিপি ব্যবহৃত হয়।

৬। দেবনাগরী – আনুমানিক খ্রিস্টীয় ১১শ বা ১২শ শতাব্দী থেকে এই লিপিটি সংস্কৃতের প্রমিত বা আদর্শ লিপি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে সংস্কৃতের অধিকাংশ বই-পুস্তকই দেবনাগরী লিপিতে মুদ্রিত হয়।

অন্যান্য আঞ্চলিক লিপি: বাংলা, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, নন্দিনাগরী, মোদী এবং তিব্বতি—এই সমস্ত লিপিই নিজ নিজ অঞ্চলে সংস্কৃত লেখার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: বর্তমানে সংস্কৃত লেখার ক্ষেত্রে দেবনাগরী লিপিই সর্বাধিক প্রচলিত; তবে এটিই একমাত্র লিপি নয়। অঞ্চলভেদে এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে আপনি এখনো ‘গ্রন্থ’, বাংলা, তেলুগু ইত্যাদি লিপিতে সংস্কৃত লেখা দেখতে পাবেন।

সংস্কৃত ভাষাকে অনেকটা লাতিন ভাষার মতোই মনে করতে পারেন—ভাষাটি মূলত একই ছিল, কিন্তু মানুষ তাদের নিজ নিজ স্থানীয় ভাষা লেখার জন্য যে লিপি ব্যবহার করত, সংস্কৃত লেখার ক্ষেত্রেও তারা সেই লিপিটিই প্রয়োগ করত।

কিন্তু প্রশ্ন আরো আছে। ব্রাহ্মী লিপিতে অশোকের আগে কোনো উদাহরণ নেই কেন? পানিণির ব্যাকরণ এত সমৃদ্ধ যে বিনা লিপিতে লেখা ভাবা যায় না। পানিণি অশোকের থেকে তিন শতাব্দী আগে আবির্ভুত হয়েছিলেন।

আমাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে পাণিনির নিজের হাতে লেখা কোনো পাণ্ডুলিপি নেই; তাই আমরা ১০০% নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি না যে, “তিনি এটি অমুক লিপিতে লিখেছিলেন।” পণ্ডিতরা এ বিষয়ে যা জানেন, তা নিচে দেওয়া হলো:

১. পাণিনির সময়কাল: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ থেকে ৪র্থ শতাব্দী।

২. তাঁর যুগের লিখনপদ্ধতি: সেই সময়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রচলিত প্রধান লিপিটি ছিল ব্রাহ্মী। এর এক বা দুই শতাব্দী পরে সম্রাট অশোকের শিলালিপিগুলো এই লিপিতেই উৎকীর্ণ হয়েছিল; তাছাড়া পরবর্তীকালের অধিকাংশ ভারতীয় লিপিরই আদি উৎস হলো এই ব্রাহ্মী লিপি।

৩. পাণিনি কি এটি স্বয়ং লিখে রেখেছিলেন?

তিনি আদৌ লিখনপদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল একটি অত্যন্ত স্মৃতিসহায়ক ও মৌখিক পাঠ্য হিসেবে—এর ৪,০০০ সূত্র এমনভাবে বিন্যস্ত ছিল, যাতে সেগুলো সহজেই মুখস্থ করা যায়। পাণিনি তাঁর গ্রন্থে লিপি (লিখনপদ্ধতি) এবং লিপিকর (লেখক বা নকলনবিশ)-এর উল্লেখ করেছেন; সুতরাং তিনি জানতেন যে, লিখনপদ্ধতির অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁর এই ব্যাকরণ গ্রন্থটি নিজে লিখেছিলেন, নাকি কাউকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন (অর্থাৎ শ্রুতলিপি হিসেবে দিয়েছিলেন)—তা আমাদের অজানা।

৪. যেভাবে এটি আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে:

অষ্টাধ্যায়ী-র যে প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিগুলো আজো টিকে আছে, সেগুলো অনেক পরবর্তীকালের রচনা। অঞ্চলভেদে এই পাণ্ডুলিপিগুলো গুপ্ত, শারদা, দেবনাগরী, গ্রন্থ ইত্যাদি বিভিন্ন লিপিতে লিখিত। বর্তমানে এই গ্রন্থটি সাধারণত দেবনাগরী লিপিতেই মুদ্রিত হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন : বিদ্যাসাগর নাস্তিক ছিলেন না

সুতরাং, এর সংক্ষিপ্ত উত্তরটি হলো:

যদি পাণিনি এটি স্বয়ং লিখেও থাকেন, তবে তা সম্ভবত ব্রাহ্মী লিপিতেই লেখা হয়েছিল—কারণ তাঁর সময়ে এবং তাঁর অঞ্চলে এই লিপিটিই প্রচলিত ছিল। কিন্তু সেই যুগের ঐতিহ্য ছিল মূলত মৌখিক; তাছাড়া আমাদের কাছে পাণিনির নিজের হাতে লেখা (স্বাক্ষরিত) কোনো পাণ্ডুলিপিও নেই। বর্তমানে আমাদের হাতে অষ্টাধ্যায়ী-র যে সংস্করণগুলো রয়েছে, সেগুলোর সবই পরবর্তীকালের বিভিন্ন লিপিতে লিখিত।

বিষয়টিকে হোমারের ইলিয়ড মহাকাব্যের প্রেক্ষাপটে তুলনা করে দেখা যেতে পারে—আমাদের কাছে হোমারের নিজের হাতের লেখা নেই; আছে কেবল অনেক পরবর্তীকালের কিছু অনুলিপি, যা গ্রিক বর্ণমালায় লিখিত—এবং সেই গ্রিক বর্ণমালাগুলোও বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপটি ধারণ করেছিল হোমারের সময়কালের অনেক পরে।

কিন্তু প্রশ্ন ছাড়ে না। এত মুখস্থ করত কীভাবে এবং তা অক্ষত রইল কী করে? মুখস্থ করলে তা বিকৃত হতে বাধ্য। অথবা বলতে হয় তাঁদের দানবীয় স্মৃতিশক্তি ছিল, যা কষ্টকল্পিত। মনে হয় কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে পণ্ডিতগণ শ্রুতি, স্মৃতির গল্প চালু করেছেন।

সুদীপনারায়ণ ঘোষ

ব্রাহ্মী লিপি

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments