বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, বঙ্গে কৃষ্ণ অদ্বিতীয়; আপামর বাঙালির কাছে ‘কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং‘। বাংলার ভাগ্যাকাশে যখন অধর্মের কালো মেঘ ঘনীভূত, যবন প্রভাবে সাধারণ হিন্দু হরিনাম সংকীর্তন করতেও শঙ্কিত—ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে বিপ্রবংশে আবির্ভূত হন ব্রাহ্মণ–কুলতিলক বিশ্বম্ভর মিশ্র। বঙ্গে জন্মেছে অথচ এই মহামানবের নাম শোনেনি, এমন শিশু খুঁজে পাওয়া বিরল। (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু)

মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে পাঠককে একটি বিশেষ জীবনদর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। মনুষ্য সমাজ সাধারণত দুই ধরণের ব্যক্তিত্বকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে:
প্রথমত: যাঁদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, ক্ষমতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জোরপূর্বক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়।
দ্বিতীয়ত: যাঁরা কোনো বাহ্যিক শক্তির সহায়তা ছাড়াই কেবলমাত্র নিজ চারিত্রিক তেজ ও কৃতিগুণে জনমানসে অক্ষয় স্থান করে নেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন এই দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। পাঠক নিজ প্রজ্ঞা দিয়ে বিচার করলেই বুঝতে পারবেন, ইতিহাসের পাতায় প্রথম শ্রেণীতে কাদের ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।
চৈতন্যদেবকে নিয়ে অনেক চলচ্চিত্র বা ধারাবাহিক নির্মিত হলেও তাঁর জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায় আজও সাধারণের অগোচরে রাখা হয়। সম্ভবত সেই অংশটি তুলে ধরলে আধুনিক ‘মেকলে–প্রোথিত‘ কেরানি মানসিকতায় চরম আঘাত লাগার ভয় থাকে। প্রশ্ন উঠতে পারে—আমি এই ইতিহাস জানলাম কোথা থেকে? আর আজ তা জানানোর উদ্দেশ্যই বা কী?
আমি এই সত্যের সন্ধান পেয়েছি ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত‘ থেকে। আর উদ্দেশ্য? যে ইতিহাসকে সুপরিকল্পিতভাবে আপনার থেকে আড়াল করে রাখা হয়েছে, তাকে অনুধাবন করা। বর্তমান বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে মহাপ্রভুর সেই প্রকৃত স্বরূপটি জানা আজ একান্ত আবশ্যক।
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের আদি লীলার সপ্তদশ পরিচ্ছেদে চাঁদ কাজীর যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা তৎকালীন হিন্দু সমাজের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।
সন্ধ্যায় গঙ্গাস্নান করি সবে গেলা ঘর ॥
নগরিয়া লোকে প্রভু যবে আজ্ঞা দিলা।
ঘরে ঘরে সংকীর্তন করিতে লাগিল। ॥
“হরি হরয়ে নমঃ কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ।
গোপাল গোবিন্দ রাম শ্রীমধুসূদন ॥”
মৃদঙ্গ করতাল সংকীর্তন মহাধ্বনি।
হরি হরি ধ্বনি বিনা অন্য নাহি শুনি ॥
শুনিয়া যে ক্রুদ্ধ হৈল সকল যবন।
কাজী পাশে আসি সবে কৈল নিবেদন ॥
ক্রোধে সন্ধ্যা কালে কাজী এক ঘরে আইল।
মৃদঙ্গ ভাঙ্গিয়া লোকে কহিতে লাগিল ॥
এতকাল কেহ নাহি কৈল হিন্দুয়ানি।
এবে যে উদ্যম চালাও কেন বল জানি ॥
কেহ কীর্তন না করিহ সকল নগরে।
আজি আমি ক্ষমা করি যাইতেছি ঘরে ॥
আর যদি কীর্তন করিতে লাগি পাব।
সর্বস্ব দণ্ডিয়া তার জাতি যে লইব ॥
এত বলি কাজী গেল, নগরিয়া লোক।
প্রভু–স্থানে নিবেদিল পাঞা বড় শোক ॥
প্রভু আজ্ঞা দিল যাহ করহ কীর্তন।
আমি সংহারিব আজি সকল যবন ॥
পংক্তিগুলোতে স্পষ্ট যে, তখনকার শাসকরা হিন্দুদের ধর্মীয় স্বাধিকারকে কেবল ঘৃণা নয়, বরং আইনত নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল।
চাঁদ কাজীর দম্ভোক্তি ছিল:
“এতকাল কেহ নাহি কৈল হিন্দুয়ানি। / এবে যে উদ্যম চালাও কেন বল জানি ॥“
এই ‘হিন্দুয়ানি‘ শব্দটির ব্যবহার প্রমাণ করে যে, তৎকালীন হিন্দুরা নিজেদের সংস্কৃতি প্রকাশ করতে ভয় পেতেন। কাজীর নির্দেশে যখন সংকীর্তনের মৃদঙ্গ ভেঙে দেওয়া হলো, তখন তা কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র ভাঙা ছিল না, তা ছিল বাঙালির ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর এক চরম আঘাত। কাজীর হুমকি ছিল আরও ভয়াবহ— “সর্বস্ব দণ্ডিয়া তার জাতি যে লইব।” অর্থাৎ, কেবল সম্পদ কেড়ে নেওয়াই নয়, বরং সামাজিক সম্মান ও ধর্ম কেড়ে নেওয়ার (ধর্মান্তরকরণ) এক সুপরিকল্পিত হুমকি জারি ছিল সেই সময়।
যবন শাসকদের এই চরম নিপীড়নের মুখে সাধারণ মানুষ যখন শোকাতুর ও আতঙ্কিত (“পাঞা বড় শোক“), তখন মহাপ্রভু যে পথ দেখিয়েছিলেন, তা ছিল সমকালীন ইতিহাসের প্রথম ‘নাগরিক অবাধ্যতা‘ বা Civil Disobedience। তিনি কেবল নামগান করেননি, বরং হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন। কাজীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি অভয়বাণী দিয়েছিলেন—
“যাহ করহ কীর্তন / আমি সংহারিব আজি সকল যবন।”
অতঃপর
এইমত কীর্তন করি নগরে ভ্রমিলা।
ভ্রমিতে ভ্রমিতে সবে কাজী–দ্বারে গেলা ॥
তর্জ্জন গর্জন করি করে কোলাহল।
গৌরচন্দ্র বলে লোক প্রশ্রয় পাগল ॥
কীর্তনের ধ্বনিতে কাজী লুকাইল ঘরে।
তর্জ্জন গর্জন শুনি না হয় বাহিরে ॥
উদ্ধত লোক ভাঙ্গে কাজীর পুষ্পবন।
বিস্তারি বর্ণিলা ইহা দাস বৃন্দাবন ॥
তবে মহাপ্রভু তার দ্বারেতে বসিলা।
ভব্য লোক পাঠাইয়া কাজীরে আনিলা ॥
দূর হৈতে আইলা কাজী মাথা নোয়াইয়া।
যে কাজীর ভয়ে নবদ্বীপের সাধারণ হিন্দুরা ঘরে সিঁধিয়ে থাকতেন, মহাপ্রভুর নেতৃত্বে সেই ভয়ের চাকা উল্টো দিকে ঘুরল। উত্তেজিত জনতা কাজীর শখের পুষ্পবন ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল। সংকীর্তনের প্রবল মহাধ্বনি এবং হাজার হাজার মানুষের ‘তর্জন–গর্জন‘ শুনে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী কাজী ভয় পেয়ে ঘরের ভেতর আত্মগোপন করলেন— “কীর্তনের ধ্বনিতে কাজী লুকাইল ঘরে“। যে শাসক হিন্দুদের মৃদঙ্গ ভেঙেছিল, আজ সেই শাসকের বিলাসিতার প্রতীক ‘পুষ্পবন‘ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে জনতা বুঝিয়ে দিয়েছিল যে—আঘাতের পাল্টা আঘাত দেওয়ার শক্তি তাদের আছে।
বর্তমানে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবিদের মধ্যে এক অদ্ভুত ‘বৌদ্ধিক বেশ্যাবৃত্তি‘ বা সত্য গোপনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ এক রাজনৈতিক ও আদর্শগত ন্যারেটিভকে তুষ্ট করতে তাঁরা প্রচার করেন যে, ব্রিটিশরা আসার পূর্বে এ দেশে কোনো ধর্মীয় বিভেদ ছিল না; হিন্দু–মুসলিম ছিল চিরকালীন ‘ভাই–ভাই‘। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, মধ্যযুগের মুসলিম শাসকরা কেবল দিল্লি বা গৌড়ের সিংহাসনে আসীন থাকতেন এবং গ্রামবাংলার সাধারণ জীবনে তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ত না। কিন্তু ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত‘-এর পাতায় চাঁদ কাজীর এই অধ্যায়টি সেই সুপরিকল্পিত মিথ্যাচারের মূলে কুঠারাঘাত করে।
চরিতামৃতের বর্ণনা অনুযায়ী, নবদ্বীপের সাধারণ মানুষের অন্দরমহল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল শাসকের রক্তচক্ষু। চাঁদ কাজী কেবল একজন দূরবর্তী প্রশাসক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তৃণমূল স্তরে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতীক। যখন তিনি হিন্দু পাড়ায় ঢুকে ‘মৃদঙ্গ‘ ভেঙে দেওয়ার আদেশ দেন এবং হুমকি দেন— “এতকাল কেহ নাহি কৈল হিন্দুয়ানি“, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাধারণ মানুষের ধর্মীয় স্বাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ আসার কয়েক শতাব্দী আগেই। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ কোনোমতেই শাসনের প্রভাবমুক্ত বা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে ছিল না; বরং তা ছিল এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।
তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা কেন এই সত্য আড়াল করেন? কারণ মহাপ্রভুর এই ‘বিপ্লবী‘ এবং ‘প্রতিরোধমূলক‘ সত্ত্বাকে সামনে আনলে তাঁদের সাজানো ‘সেকুলার মধ্যযুগ‘-এর তাসের ঘরটি ভেঙে পড়ে। মহাপ্রভুর নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষের কাজীর বাড়ি ঘেরাও করা এবং কাজীর ‘পুষ্পবন‘ ধ্বংস করা ছিল বাঙালির প্রথম সংগঠিত গণ–বিস্ফোরণ। শাসক যখন ধর্মীয় অধিকার হরণ করে, তখন প্রজা যে নতিস্বীকার না করে পাল্টা আঘাত করতে পারে—এই বীরত্বগাথা আমাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে সচেতনভাবে মুছে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন : রাঢ়বঙ্গের ধর্মঠাকুর – ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় স্বরূপ
বর্তমান বাংলার পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই ইতিহাস পুনরায় পাঠ করা আবশ্যক। ব্রিটিশরা বিভেদ তৈরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু তার আগে হিন্দু সমাজকে যে চরম রাষ্ট্রীয় অবদমন এবং সাংস্কৃতিক দাসত্বের মধ্যে দিন কাটাতে হতো, সেই সত্যটুকু অস্বীকার করা মানে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা। আজ সময় এসেছে সেই মেকলে–প্রোথিত মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে ইতিহাসের প্রকৃত সত্যকে জনসমক্ষে আনার।
“তবে ত নগরে হয় স্বচ্ছন্দে কীর্তন। / শুনি সব ম্লেচ্ছ আসি করে নিবেদন ॥“
“নগরে হিন্দু ধর্ম বাড়িল অপার। / হরি হরি ধ্বনি বই নাহি শুন আর ॥“
এই পংক্তিগুলো কেবল ধর্মীয় ভক্তির বর্ণনা নয়, এটি একটি দীর্ঘকাল ধরে অবদমিত জাতির আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার প্রমাণ।
আজকের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা যে ‘হিন্দু–মুসলিম ভাই–ভাই’ তত্ত্ব ফেরি করেন, চরিতামৃতের এই অংশটি তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখানে দেখা যাচ্ছে, হিন্দুদের এই স্বাধিকার লাভ তৎকালীন শাসক বা ‘ম্লেচ্ছ’দের কাছে প্রীতিকর ছিল না। তারা কাজীর কাছে গিয়ে অভিযোগ করছে—সবাই ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ বলছে, হাসছে, কাঁদছে, ধুলোয় গড়াগড়ি দিচ্ছে।
তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মতে, ‘হিন্দু’ শব্দটি নাকি ব্রিটিশদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে উদ্ভাবিত একটি পরিচয়। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী যখন ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ রচনা করছেন, তখন তাঁর লেখনীতে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা এই আধুনিক বুদ্ধিজীবী মহলের বৌদ্ধিক জালিয়াতিকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করে দেয়।
“নগরে হিন্দু ধর্ম বাড়িল অপার। / হরি হরি ধ্বনি বই নাহি শুন আর ॥”
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কেন এই ইতিহাস জানা জরুরি? বর্তমান বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, বাঙালির সেই প্রতিরোধের ক্ষমতা আবারও স্তিমিত হতে শুরু করেছে। তথাকথিত প্রগতিশীল মানসিকতা আমাদের শিখিয়েছে সহিষ্ণুতার নামে অন্যায়কে মেনে নিতে। কিন্তু শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত আমাদের শেখায় যে, যখন নিজের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসে, তখন একত্রিত হওয়া এবং রুখে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত ধর্ম।
সপ্তর্ষি পাহাড়ী