অদ্ভুত একটা বিষয় প্রায় গত আড়াইশ বছর ব্যাপী ইউরোপ-ভারতজুড়ে বিদ্বৎজনদের ব্যস্ত রেখেছে আর তা হল প্রাচীনতম সভ্যতার উৎসস্থল কোথায়? ইউরোপ ও তার প্রসারিত অংশ আমেরিকার অহমিকা এত বেশি যে তারা একটা স্ব তঃসিদ্ধ সত্যকে কিছুতেই স্বীকৃতি দিতে পারছে না যে প্রাচীনতম ভাষা-সংস্কৃতি-সভ্যতার সূতিকাগার এই ভারতভূমি। নানারকম উদ্ভট অপ্রমাণিত সত্য-কল্পকে আঁকড়ে ধরে আছে তারা। আর ভারতের বাম-নেহরুপন্থীরা আত্মঘাতীভাবে সেই মিথ্যায় বাতাস করে যায়। খুলে বলি। (world oldest civilization)
সিন্ধু সভ্যতা (যা আসলে সরস্বতী সভ্যতা) বাইবেল-বর্ণিত মহাপ্লাবনের বহু পূর্বে আত্মপ্রকাশ করেছিল আর সেটা এই পশ্চিমী আত্ম-গর্বীদের মানতে অসুবিধা। সব প্রমাণ সত্ত্বেও তারা একটা অতি প্রাচীন কল্পিত ভাষাকে বলছে সব ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার আদি জননী—প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। সাক্ষ্য-প্রমাণ বলছে সংস্কৃত আজ থেকে ন্যুনতম আট-দশ হাজার বছরের পুরনো ভাষা কাজেই সব ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার আদি জননী সংস্কৃত এবং সভ্যতার পুণ্যভূমি এই ভারতবর্ষ কিন্তু তাদের অহং বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সিন্ধু সভ্যতার উদ্ঘাটন ১৮৭০ সালে ও তৎপরবর্তী অধুনা ২০২৫ পর্যন্ত ক্রমাগত এই সরস্বতী সভ্যতার অসংখ্য—৪০০০এর অধিক—প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়েছে। যদিও মাত্র ৫% গবেষণা হয়েছে তাতেই অনেকটাই নিশ্চিত যে ভারতীয় সনাতন বৈদিক ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ইউরোপীয় ভাষা-সংস্কৃতি। (world oldest civilization)

মেসোপটেমিয়ায় মিলেছে হরপ্পা সভ্যতার বহু জিনিস। এর অর্থ হরপ্পা থেকে বহির্বাণিজ্য হত মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত। কিন্তু বিপরীতটা হয়নি। দ্বিতীয়ত হরপ্পার কোনো শাসক গোষ্ঠীর সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। কোনো গ্রন্থে শাসক গোষ্ঠীর কথা পাওয়া যায়নি। সমুদ্রযাত্রার উপযুক্ত চিহ্ন নেই।
শিশুদের খেলনা, পোষ্য প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। লোথালে ও ধোলাভিরায় সমুদ্র ডকের সন্ধান মিলেছে। দাবার প্রাচীন প্রকারও আছে। ৩৫০০টা সিল, ও কয়েকশ পটারি, তামা ও রৌপ্যের গহনা ও টেরাকোটার নিদর্শনে কিছু লিখিত অংশ আছে কিন্তু এখনো তার পাঠোদ্ধার করা যায়নি।
কোথাও কোনো রয়াল টুম বা প্যালেসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবুও এত নিখুঁত শৃঙ্খলা কে বজায় রাখত? কোনো শাসনতন্ত্র বিনা শুধু সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলা দিয়ে বিশ্বের অন্যত্র কোথাও সভ্যতা চলেনি। সুতরাং এখানে মিসিং লিঙ্ক স্পষ্ট। আর কাস্ট ব্যবস্থা যেটা কোনো বিদেশি পণ্ডিত বলছেন বা বলে চলেছেন সেটা ভুল কারণ কাস্ট শব্দটাই ভারতীয় নয়। এখানে যেটা ছিল তা হল পেশা অনুসারে কিছু মানুষ একত্রিত হত এবং সেই বিষয়টা ছিল পুরোপুরি গুণ ও কর্মভিত্তিক।
সিন্ধু সভ্যতা শেষ হয়েছে ১৯০০ বিসিতে আর আর্য আক্রমণ তত্ত্ববিদরা বলছেন আর্যরা এসেছে ১৫০০ বিসিতে। ৪০০ বছরের ফাঁকটা কিছুতেই মেলানো যাচ্ছে না। সিন্ধু সভ্যতার কোথাও কোনো মৃতদেহের অস্তিত্ব মেলেনি। কোনো বড় আক্রমণের চিহ্নও নেই।
সেখানে প্রাপ্ত তৈজসপাত্রের গড়ন নীচের দিকে বর্তুল আকার ও একেবারে নীচে সমতল, আজও তাই চলছে। সিঁথির সিঁদুর যা ওখানে প্রাপ্ত নারীমূর্তিতে আছে তা এখনো সারা ভারতে প্রচলিত। লাল রঙ পরিষ্কার সিঁদুরের সাক্ষ্য বহন করে আর হাতে চুড়ির হলুদ রঙ স্বর্ণালঙ্কারের পরিচয় বহন করে। বুকের কাছে দুহাত জড়ো করে থাকা মূর্তি ভারতীয় নমস্কার প্রথার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত।
সারি দিয়ে হাতে চুড়ি পরা নারী মূর্তি মিলেছে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সর্বত্র; রাজস্থানের মহিলারা এখনো পরেন। এছাড়া আছে শঙ্খের বালা পরা যা আজও আছে। কৃষ্ণনগরে যে শঙ্খ তৈরি হয় তার সঙ্গে এই সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত শঙ্খের গড়নে হুবহু মিল রয়েছে।
ঐতিহাসিকরাটা একটা বিষয় একমত হতে পারছে না। সব জায়গায় দীর্ঘ গলকম্বল বিশিষ্ট ষাঁড়ের মূর্তি।
সিন্ধু সভ্যতার ভাষার এখনো পাঠোদ্ধার করা যায়নি। তবে সাঙ্কেতিক চিহ্ন খুব বেশি নেই। এটা কোনো ভাষা না হয়ে লেখকের মতে এটা কোনো সঙ্কেত বা ব্যবসায় সংক্রান্ত কিছু হতে পারে। ভারতীয়দের চিরকালীন ত্রুটি রেকর্ড না রাখা সেই ধারা সিন্ধু সভ্যতায়ও সম্ভবত ছিল।
ব্রাহ্মী লিপি ও হরপ্পান লিপির মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে।
স্বস্তিকা, সীমাহীন রজ্জুবন্ধন ও ইউনিকর্ণ বা একশৃঙ্গ বলদ এই প্রতীকগুলো অজস্র পরিমানে মিলেছে যেগুলো আজও ভারতসহ বিশ্বের বহুস্থানে পাওয়া যায়। ময়ূর, মাছ ও অশ্বত্থ পাতার প্রতি সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতার প্রবল আবেগ ছিল। ষাঁড়ের পক্ষে মহেঞ্জোদারোর ঐ ত্রি-মস্তক শিবের বাহন হওয়ার সম্ভাবনার প্রতি লেখক জোর দিয়েছেন। কালিবঙ্গানে পাওয়া টেরাকোটায় আছে শিবলিঙ্গ। ফায়ার অল্টারগুলো আসলে ইরানীয় সভ্যতার নিরন্তর আগুন জ্বালানোর পদ্ধতি না রান্নার উনুন তা নিয়ে বিস্তর মতবিরোধ আছে। তবে সেগুলো আগুনের বেদী নয় বলে লেখক মন্তব্য করেছেন। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ বছর মানে আজ থেকে ৯০০০ বছরের সভ্যতায় কৃষি ও পশুপালনের নিদর্শন মিলছে। হরিণ, শূকর ও ছাগল গৃহপালিত হচ্ছে। অন্তত যে জিনিসটা ভারতে সবচেয়ে আগে গৃহপালিত হয়েছিল সেটা হল গরু। গরু এই জন্য ভারতীয় সভ্যতায় এত আদরণীয়।
আটটি যবের দানা পাশাপাশি রাখলে এক আঙুল হয়। ১০৮ আঙুলে এক দণ্ড হয় মানে ১.৯২ মিটার। একটা দণ্ডের যা দৈর্ঘ্য তার ১০৮ গুণ দূরে থেকে সূর্য বা চাঁদের দিকে তাকালে তাদের ব্যাসের সঙ্গে মিলে যায়। ১০৮টা পদ্ম, ১০৮ শিবের নাম এই ১০৮ তাই ভারতীয় সভ্যতায় খুব তাৎপর্য বহন করে। ভারতীয় মুদ্রা, ওজন ব্যবস্থা সবই এই আদি সিন্ধু-রীতির সঙ্গে ধারাবাহিকতা মেনেই চলেছে।
মর্টিমার হুইলার নিজেই তার আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে বাতিল করেছেন তবুও আমাদের দেশের স্কুলপাঠ্য বইয়ের লেখকরা সেই পুরনো তত্ত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের, কম শিক্ষিত, বেশি শিক্ষিত সবারই, ইতিহাস জ্ঞান ঐ স্কুলপাঠ্য বইতেই সীমাবদ্ধ আর রাজনীতিটা চলে ঐ ভুল ইতিহাসের উপর। সেটা নেহরুপন্থী ও বামপন্থী আব্রহামিকদের সুখপাঠ্য বিষয় হয়ে থেকে গেছে। সংস্কৃত ভাষায় দ্রাবিড়ীয় শব্দের অপ্রতুলতা দেখিয়ে দেয় যে দ্রাবিড়িয়ান হরপ্পার দাবি ধোপে টেকে না।
হঠাৎ করে সিন্ধু সভ্যতা গজায়নি আবার হঠাৎ করে পতনও হয়নি। ধীরে ধীরে সেগুলো সরে গেছে অন্যত্র ২৬০০-৩৯০০ বছর আগে পর্যন্ত। হরপ্পা-পরবর্তী যুগের ইতিহাসকে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। বিধ্বংসী টেকটনিক অপসারণের ফলে সরস্বতী নদী ধীরে ধীরে পূর্বে সরে যেতে থাকে এবং ৩৯০০ বছর আগে তা একেবারেই শুকিয়ে যায়। ব্যাপারটা যেহেতু ধীর লয়ে ঘটেছিল তাই ঐ সভ্যতার মানুষরা ধীর লয়ে অন্যত্র সরে গিয়ে বসতি স্থাপন ও সভ্যতা তৈরি করে। কিন্তু এই পর্বের ইতিহাসকে কেন আলোকিত করা হচ্ছে না?
নিকোলাস কাজানাস ‘এআইটি’র পরিবর্তে ‘ওআইটি’ বা ‘আউট অব ইন্ডিয়া’ তত্ত্বের পক্ষে জোরালো সমর্থন করেছেন। প্রোটো ইন্দো-ইউরোপীয়ান ভাষার সপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য সমর্থন এখনো মেলেনি তবে এই রকম ভাষা ছিল না তাও এখনো বলা যাচ্ছে না। ল্যারিঙ্গাল ধ্বনি একটি পিআইই বৈশিষ্ট্য এবং হিটাইট ভাষায় এই ধ্বনি চিহ্নিত করে তাকেই প্রাচীন পিআইই ভাষা ধরে তার উৎস স্থল হিসাবে অ্যানাটোলিয়াকেই প্রাচীন হেরউইম্যাট বা সেই আদি বাসভূমি ধরলেও তাতে সংস্কৃতের প্রাচীনত্ব কিন্তু কিছু কমে যায় না কারণ সংস্কৃতই সেই আদি আর্য ভাষা যেখানে পিআইই ভাষার বৈশিষ্ট্যগুলি সবচেয়ে বেশি সংরক্ষিত হয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় অ্যাপোফোনি, প্রোজোডিক অ্যাপোফোনি ও কনসোনান্ট অ্যাপোফোনি পুরোমাত্রায় নিয়মানুবর্তী। সুতরাং যে ভাষায় একটি কমন ফিচার এমন নিখুঁতভাবে রক্ষিত সেই ভাষার উৎস স্থল ভারত কেন নয় সেই আদি ভূমি বা উরহেইম্যাট? না তা হয়নি কারণ এইসব স্কলারদের ‘ভেস্টেড ইন্টারেস্ট আর স্কলারলি পোস্টে’র প্রলোভন দায়ী। এইসব গবেষণা বাজে কাগজের ঝুড়িতে যাবে এক সময়।
এই বিশাল গ্রন্থে লেখক অত্যন্ত বিশদে আর্য আক্রমণ তত্ত্বের ভ্রান্তি ঘুচিয়েছেন। এই তত্ত্বের প্রবক্তা ও এর বিরোধী উভয়ের জন্যই এই গ্রন্থটি পাঠ জরুরি। কিছু মুদ্রণ প্রমাদ উপেক্ষা করে বলতেই হয় বাংলা ভাষায় এই রকম গবেষণামূলক গ্রন্থের অভাব আছে। লেখক এই কারণে অবশ্যই ধন্যবাদার্হ।
সুদীপনারায়ণ ঘোষ
আরও পড়ুন : দুর্গা সপ্তশতীর গূঢ়তত্ত্ব — কোন কোন অসুরকে কেন বধ করতে হয়?