Tuesday, February 3, 2026
HomeArticlesResearch & Scholarlyদুর্গা সপ্তশতীর গূঢ়তত্ত্ব — কোন কোন অসুরকে কেন বধ করতে হয়?

দুর্গা সপ্তশতীর গূঢ়তত্ত্ব — কোন কোন অসুরকে কেন বধ করতে হয়?

দুর্গা সপ্তশতীতে উল্লেখিত প্রথম দৈত্যজুটি হল মধু ও কৈটভ। তারা কারা? তারা আমাদের বুদ্ধি ও অহংকার। এরা দুটো নাম, মানে মিষ্টি ও তেতো, দুটো সবচেয়ে মৌলিক উপাদান যা প্রতি মানুষের থাকে। কেন? একটা শিশু জন্মের পরে, খুব শৈশবে, আমরা তাদের কী খাওয়াব তা নিয়ে চিন্তায় পড়ি। শিশুদের জিবে স্বাদ আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা মিষ্টি এবং তেতো দুটো স্বাদের তফাৎ করতে পারে। তাদের বুদ্ধিও তখন থেকে বিকাশ লাভ করে। আমাদের কথার মধ্যেও মধুর ও তিক্ত দুই থাকে। তাই শিশুদের স্বাদ বিকাশের আগে আমরা তাদের সান্ত্বনা দিতে পারি, মিষ্টি কথা আর ঘুমপাড়ানি গান দিয়ে শান্ত করতে পারি। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে তার মধ্যে একটা সুর জুড়ে দিই, মিঠে ও কড়া, এটা সহজাত ভাবে আসে সব মানুষের মধ্যে। (Durga Saptashatir Gudhatattva)

যে কোনো সাধকের আত্মোপলব্ধির পথে প্রাথমিক বাধা হ’ল এই মধুর ও তিক্ত দ্বৈততার ঊর্ধ্বে ওঠা; এর জন্য আমাদের বলপ্রয়োগ বা দেবদেবীরও প্রয়োজন নেই, আমাদের প্রয়োজন বিষ্ণুর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা যাকে আমাদের আজীবনের সঙ্গী ক’রে রাখতে হবে। এই মাধুর্য ও তিক্ততা শুধু জিবে নয় আমাদের মনেও থাকে। আমরা জিবের স্বাদ বা অন্য কোনো স্বাদ সম্পূর্ণ বিলোপ করতে পারব না। আমরা হয়তো একে দমন করতে পারি আংশিক কিন্তু গতকাল যদি কেউ আমাকে নোনতা কিছু খাওয়ায় আমি অনুভব করব এটা নোনতা আমি বলব না যে তা মিষ্টি ছিল; তাই এমন নয় যে আমরা স্বাদ অনুভব করতে পারব না। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হ’ল আমি এর দ্বারা প্রভাবিত হব না। আমি সেখান থেকেই ‘গ্রহণ ও বর্জনের’ পার্থক্য বুঝতে শিখব। আমি সচেতন হব আমি এটা গ্রহণ করতে চাই কিংবা চাই না। কিন্তু স্বাদ এবং শব্দের প্রতি স্পর্শকাতরতার উপরে উঠতে হবে। কেউ ভালো কথা বললেও আমি ধন্যবাদ বলব, কেউ খারাপ কথা বললেও ধন্যবাদ বলব। এইভাবে একবার আমরা যদি সেই অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা অতিক্রম করি তখন কে আমাদের কী জিজ্ঞাসা করেছে, অন্যরা আমাদের সম্পর্কে কী বলছে, কী ভাবছে, কীভাবে সম্বোধন করবে তা নিয়ে মাথা ঘামাব না। প্রথমে মনে হবে মধুর কথা বা স্বাদ তো ভাল জিনিস, তিক্ত না হয় খারাপ। তাহ’লে মধুকে কেন দৈত্য বলা হয়। এখানেই বুঝতে হবে যে মধুর ও তিক্ত দুটোরই দ্বারা প্রভাবিত হওয়া খারাপ। এরা একে অপরের পরিপূরক। তাই দুটোকেই অসুর বলা হচ্ছে। (Durga Saptashatir Gudhatattva)

Durga Saptashatir Gudhatattva
Durga Saptashatir Gudhatattva

পরের বাধা মহিষাসুর। মহিষাসুর হল লালসা ও প্রতিশোধের জ্ঞান। তারা যে কোনো সাধককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। একবার আমরা স্বাদ-শব্দের বশীভূত হ’লে আমরা তখন মহিষাসুরের হাতে নাস্তানাবুদ হব। আমাদের সমস্ত শক্তিকে সঠিক পথে চালনা করতে হবে যে শক্তি দিয়ে সেই শক্তির প্রতীক দেবী দুর্গা। তিনি শক্তির চিহ্ন। আমরা অসুরদের একেবারে নিঃশেষ করতে পারব না, আমরা তাদের রূপান্তরিত করব। আমরা আরো এগিয়ে যাব। মহিষাসুরকে অতিক্রম করব। এখন আমরা মিষ্টি বা তিক্ত কথা ও স্বাদে বিরক্ত হব না। আমাদের নিজস্ব শক্তি কাজে লাগাতে শিখতে হবে, কারণ রাগও শক্তির এক বিশাল বহিঃপ্রকাশ। এখন আমরা শিখব কীভাবে অপব্যয় না ক’রে নিজের শক্তিকে কাজে লাগাতে হয়।

এখন আমরা পরবর্তী স্তরে শুম্ভ-নিশুম্ভে যাব। তার আগে ধূম্রলোচনকে বুঝে নেওয়া যাক। ধুম্র মানে ধোঁয়া, লোচন মানে দৃষ্টি। আমার দৃষ্টি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে তাকে তার থেকে মুক্ত হ’তে হবে কারণ আমরা অনবরত চোখের মাধ্যমেই তথ্য সংগ্রহ করি। তারপরে আমাকে যত্নশীল হতে হবে কীভাবে আমি এই বিভ্রমের উপরে উঠতে পারি এবং কীভাবে আমি বিভ্রান্ত না হই, এটা যে কোনো সাধকের বা সত্যান্বেষীর পরের পদক্ষেপ। আমরা যতই পন্ডিত হোই না কেন, যতই সপ্রতিভ হই না কেন, যতই বুদ্ধিমান হই না কেন, সত্যিকারের সত্যান্বেষী হতে আমাদের এই সব পর্যায় অতিক্রম করতে হবে।

আমাদের শরীরের ছয়টা প্রধান শাখা। দুর্গা সপ্তশতীতে ছয়টি অসুর আছে এবং ৭ম সুরথ ও সমাধি এর সঙ্গে জুড়বে। সুতরাং আমরা একবার ধুম্রলোচনকে অতিক্রম করলে এমন এক পর্যায়ে যাব যেখানে শব্দ আমাদের বিরক্ত করে না, স্বাদ প্রভাবিত করে না, আমরা আমাদের শক্তি কাজে লাগাই এবং বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক হয়। আমরা শান্তিতে থাকি।

এর পর আমরা পাই চণ্ড-মুন্ড। সংস্কৃতে চন্ডর অর্থ মূলত আবেগ, এর অর্থ নিষ্ঠুরতা, এর অর্থ হিংসাও। এবং মুন্ড হল মাথা, বুদ্ধি, অন্তরের বিবেক। পুর্বের পরিচ্ছেদে বর্ণিত পথ অনুসরণ ক’রে আমরা আর রাগান্বিত নাও হতে পারি, লালসা এবং ক্রোধে পূর্ণ নাও হতে পারি, আমরা আমাদের শক্তির ব্যবহারও করেছি। তবে তারপরেও আমাদের সেই শক্তিকে সঠিক পথে চালনা করা শিখতে হবে। এবং আমরা যদি কোন কিছুর প্রতি আবেগবিহ্বল (এই প্রবৃত্তিকেই চন্ড বলে) হই তবে আমরা সেই আবেগের কারণে সবকিছু হারাব৷ এটা ভাল আবেগ বা খারাপ আবেগ হতে পারে। কিন্তু তা একজন সত্যান্বেষীর পক্ষে বিভ্রান্তিও হতে পারে। এবং এখানেই কিছু দুর্দান্ত গুণগত বৈশিষ্ট্য অকেজো হয়ে যায়, সম্পদ ও জগৎের প্রতি মোহ, আবেগ দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে আমাদের মনোযোগ জোর করে কেড়ে নেয়, শুরুর অর্জন বিফল হয়। পৃথিবীতে সব শেষ।

যদি একজন সত্যান্বেষীকে তার আবেগকে সংযত করতে হয়, তবে তাকে ‘আমি এটা করতে চাই, এটা করতে খুব ভালো লাগে, আমি বড় আশ্রম বা বড় সংগঠন গড়তে চাই’ এই মনোভাবের উপরে উঠতে হবে কারণ এগুলো সবই বিভ্রান্তি। আমাকে শুধুমাত্র অক্সিজেন মাস্ক লাগাতে বলা হয়েছে আমার চেষ্টা করা উচিত তা করা আর কিছু নয়। এবং তারপরে যখন আমরা চূড়ান্ত সত্য সম্পর্কে ঐকান্তিক হব তখন আমরা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত হব। তখন আমরা ক্রমাগত দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাব, “আমি কি সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছি?” আমরা অনুতাপ এবং অনুশোচনার মধ্য দিয়ে যাব। তারুণ্যের অনেক আবেগ আমাদের আসবে, তারা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠবে এবং তারপরে আমাদের স্থির হতে হবে এবং সেই আবেগের মুহূর্তটা কেটে যাবে। আবার মুন্ড মানে সাধারণত মুন্ডিত মস্তক যা বৈরাগ্য বোঝায়। তবে বৈরাগ্য আবার দুই রকমের হয়। প্রথমটা হ’ল প্রকৃত বৈরাগ্য যার মানে সম্পূর্ণ আসক্তি ও মোহ মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করা। আর দ্বিতীয়টা হ’ল কৃত্রিম বৈরাগ্য। আমি কিছু কামনা ও বাসনা পূরণ না হওয়ায় জীবনবিমুখ হয়ে পড়ি। সেটা আসলে মোহ। আর মুন্ডকে অসুর বলা হয়েছে এই অর্থে।

এবং তারপর একবার চন্ড-মুন্ড অতিক্রম করলে আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী রক্তবীজের মুখোমুখি হব। রক্তবীজ কে? রক্তবীজ ছিলেন এক অসুর যে দুর্গা সপ্তশতী অনুসারে বিশেষ বর পেয়েছিল। বিশেষ বর এই যে তাকে মারলে রক্তের প্রতি ফোঁটার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে তার অনুরূপ অগণিত রক্তবীজ জন্ম নেবে। তাদেরও একই ক্ষমতা থাকবে এবং তারাও একই বর পাবে। তাহলে এমন রাক্ষসের সঙ্গে কেউ যুদ্ধ করবেন কীভাবে? প্রতিবারই একজন নিহত হবে, রক্ত ঝরবে এবং অনেক রক্তবীজের জন্ম হবে। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। রক্তবীজ হ’ল আমাদের আকাঙ্খা। আমি একটা পূরণ করলাম, আর একটা আকাঙ্খার জন্ম হবে, অগণিত, এটা চলতে থাকবে, চলতে থাকবে, চলতে থাকবে…। এটা থামবে না এবং সেই মুহুর্তে আমার শৃঙ্খলারূপ আগ্রাসন প্রয়োজন যাতে আমি রক্তবীজকে গলাঃধকরণ করতে পারি। রক্তবীজ ভাল বা খারাপ হয় না। কোন ভাল বা খারাপ ইচ্ছা নেই। ইচ্ছা মানেই খারাপ ইচ্ছা, যতই বড় হোক না, কেননা আমি যদি একটি পূরণ করি তবে আরও ইচ্ছা আসবে।

সুতরাং এখন আমি লোকেরা আমাকে কী বলে, আমাকে প্রদত্ত প্রস্তাবের স্বাদ কী তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হই না কারণ আমি মধু-কৈটভকে হারিয়েছি। আমি আমার শক্তিকে কাজে লাগাতে শিখি, লালসা এবং ক্রোধ সম্পর্কে যুক্তিবাদী হই, কারণ আমি মহিষাসুরকে জয় করেছি, আমি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিই কারণ আমি ধূম্রলোচনকে জয় করেছি। আমি আমার আবেগ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অতিক্রম করেছি, আমি চন্ডমুন্ড অতিক্রম করেছি। এমনকি আমি আমার ইচ্ছার প্রকৃতি বুঝতে পেরেছি, কারণ রক্তবীজকে বিলুপ্ত করেছি। কিন্তু আমি এখনও এক ধাপ দূরে। আর তা হল শুম্ভ-নিশুম্ভ। এটা শুভ অশুভ, প্রীতিকর ও অপ্রীতিকর, নৈতিকতা, অনৈতিকতা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, ধার্মীকতা, অধার্মিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই চিন্তাগুলি আমাকে কখনই ছাড়বে না যতক্ষণ না আমি শর্তমুক্ত হই, যতক্ষণ না আমি নিজেকে মুক্ত করি আমি সর্বদা অন্য কারও মানদণ্ডের ভিত্তিতে ভালমন্দ, অন্য কারও কাঠামোর ভিত্তিতে ঠিকভুল মাপি এবং যখন আমি তা ভাঙতে পারব তখন আমি সঠিক পথে চলব। আর অনুশোচনা, অপরাধবোধ, ভয় বা অন্য কোনো নেতিবাচক আবেগ নেই। আমি সহানুভূতি এবং প্রেমের মত ভাল প্রবৃত্তি অর্জন করব। কারণ এটাই আমার প্রকৃত অন্তর্নিহিত স্বভাব। আমার প্রকৃত স্বভাব। তাই আমাকে শুম্ভ-নিশুম্ভকে অতিক্রম করতে হবে।

এখন আমি চূড়ান্ত পুরস্কার লাভের জন্য তৈরী। মা দুর্গা এসে সুরথ ও সমাধির বর দেন। সুরথ মানে এক সূক্ষ্ম বাহন, জন্মের রথ। সর্বশ্রেষ্ঠ বাহন হল অন্তর্দৃষ্টি প্রজ্ঞা, আমি ঠিকভুল জানি, আমি দ্বৈততার ঊর্ধ্বে উঠি। সমাধি হল একতা যার ফলে কুন্ডলিনী জাগ্রত হয়।

রাক্ষসরা তিন ভাগে বিভক্ত এবং তাদের তিনটি গিঁট বা গ্রন্থি আছে – ব্রহ্মা গ্রন্থি, বিষ্ণু গ্রন্থি এবং রুদ্র গ্রন্থি, যে গিঁট আরো গিঁট তৈরি করবে, তা চিন্তা তৈরি করবে, গিঁট সেই চিন্তাগুলিকে টিকিয়ে রাখবে এবং সেই গিঁট যা আমাকে তাদের পূর্ণ করতে বা ধ্বংস করতে চালিত করবে। আমি যখন এই তিনটির উর্ধ্বে যাই তখন আমি সেই একত্ব অনুভব করি এবং এটাই দুর্গা সপ্তশতী। এটা জপ করার বিষয় নয় এটা বোঝার বিষয়।

(দুর্গা কিন্তু একাই সবাইকে বধ করেননি, তিনি শুধু মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। তবে সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়)

সুদীপনারায়ণ ঘোষ

আরও পড়ুন : রবীন্দ্রনাথ : যে আলোচনায় রাষ্ট্রবোধে সম্পৃক্ত হই

শ্রীশ্রী চণ্ডী – স্বামী সমর্পণানন্দ

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments