জগদ্গুরু ভগবৎপাদ আচার্য শঙ্করের সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষ বৈদিক কর্মকাণ্ড তথা যাগযজ্ঞ, পশুবলি আদি জাগতিক কর্মে ছেয়ে গিয়েছিলো। তখনকার সময়েরই একজন বিখ্যাত কর্মকাণ্ডীয় পণ্ডিত ছিলেন কুমারিল ভট্ট। কুমারিল ভট্টের দর্শন অনুযায়ী বৈদিক কর্মকাণ্ডই মুক্তি বা মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায় তথা যাগযজ্ঞাদির ফলেই মুক্তি লাভ হয়। কিন্তু শঙ্করের আদর্শ ঠিক তার বিপরীত। শঙ্করের মতে জ্ঞানযোগের দ্বারাই মুক্তি সম্ভব (ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে)। তিনি জীব- ব্রহ্ম একত্ববোধ ও জগতের নশ্বরত্বে বিশ্বাসী। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দুইজনের মধ্যে মতবিরোধ থাকায় তা শাস্ত্রার্থে পরিণত হতে চলেছিল। তাই সশিষ্য শঙ্কর রওনা দিলেন প্রয়াগ অভিমুখে কুমারিল ভট্টের সঙ্গে শাস্ত্রার্থ করার অভিপ্রায়ে।
তখন কুমারিল ভট্ট তুষানলে প্রাণবিসর্জন দিতে কাষ্ঠে অগ্নিসংযোগ করছেন। (sankaracharya kumarilabhatta mandanamishra)
এমন সময়ে আচার্য শঙ্কর বলে উঠলেন :
শঙ্কর : হে আচার্যপ্রবর আপনি প্রান বিসর্জন দিতে কেনো উদ্যত হয়েছেন?
কুমারিল ভট্ট : হে শঙ্কর, আমি আমার সারাজীবন যে বৈদিক শাস্ত্রের জন্য উৎসর্গ করেছিলাম সেই বৈদিক শাস্ত্রের প্রতি মনের অজান্তেই সন্দেহ প্রকাশ করার অপরাধ আমাকে দগ্ধ করছে। তাই আমি প্রাণত্যাগ করাকেই একমাত্র উপায় হিসেবে জ্ঞান করছি। কিন্তু এখানে আপনার আসার অভিপ্রায় আমি বুঝতে পারলাম না।
শঙ্কর : হে আচার্যপ্রবর, আমি অদ্বৈত দর্শনের উপর বেদান্তভাষ্য রচনা করেছি। আমার অভিপ্রায় আপনি অদ্বৈত দর্শন গ্রহন করবেন আর না হলে আপনাকে শাস্ত্রার্থে আমাকে পরাজিত করে নিজের মত সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন।
তখন কুমারিল ভট্ট শঙ্করের বেদান্তভাষ্যটি দেখলেন এবং শঙ্কর যে কোনো সাধারন ব্যক্তিমাত্র নয় তা বুঝলেন। কিন্তু তিনি প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে প্রান বিসর্জন দেবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই তিনি বিনম্র ভাষায় বললেন, হে আচার্যশ্রেষ্ঠ, আমি আমার সম্পূর্ণ জীবন বৈদিক ধর্ম প্রতিষ্ঠার লক্ষে ব্যয় করেছি ও বৌদ্ধ নাস্তিক্যবাদের খন্ডন করেছি। কিন্তু আমি বেদের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করায় প্রাণবিসর্জন দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই আপনি আমার শিষ্য মন্ডন মিশ্রের সান্নিধ্যে গমন করুন। জানবেন, তাকে পরাজিত করা মানেই আমাকে পরাজিত করা। আর বিচারক হিসেবে মণ্ডনপত্নী উভয়ভারতীকে রাখবেন। তাকে সাক্ষাৎ সরস্বতী বলে জানবেন। (sankaracharya kumarilabhatta mandanamishra)

অতঃপর শঙ্কর রওনা হলেন নর্মদা তীরবর্তী মাহিষ্মতী নগরে কুমারিলভট্টের উদ্দেশ্যে। গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন যে বাড়িতে টিয়া পাখি পর্যন্ত বেদ আবৃত্তি করছে জানবেন সেটিই মহাপণ্ডিত মণ্ডনমিশ্রের বাটিকা। আচার্য শঙ্কর মণ্ডনমিশ্রের বাটিকায় পৌঁছে তো গেলেন কিন্তু সেইদিন ছিলো তাঁর পিতার শ্রাদ্ধ। তাই তিনি আচার্যকে অনুরোধ করলেন শ্রাদ্ধ না হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতে। কিন্তু শঙ্কর তা না করে যোগবলে শ্রাদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। শ্রাদ্ধে কর্মহীন সন্ন্যাসীকে দর্শন করে মণ্ডনমিশ্র তাকে যারপরনাই অপমান করতে লাগলেন। কিন্তু শঙ্কর তাতে অপমানবোধ না করে উপহাসছলে তাকে এমন এমন প্রশ্ন করলেন যাতে মণ্ডন মিশ্র স্বয়ং অপমানিত বোধ করতে লাগলেন।
পরবর্তীতে ব্যাস ও জৈমিনিকল্পের পুরোহিতদ্বয়ের অনুরোধে তিনি শান্ত হন ও শঙ্করের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তখন শঙ্কর বলেন আমি আপনার সাথে শাস্ত্রার্থ করতে চাই কারন আপনার গুরু কুমারিল ভট্ট প্রান বিসর্জন দিতে উদ্যত যে কারনে তিনি আপনার সাথে শাস্ত্রার্থ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তখন মন্ডন মিশ্র বললেন, আপনি কি বিষয়ে শাস্ত্রার্থ করতে চান হে সন্ন্যাসীপ্রবর?
শঙ্কর বললেন, অদ্বৈতবোধেই মুক্তি, জীব-ব্রহ্ম একত্ববোধই সাধনার মূল লক্ষ্য। কর্মকাণ্ড ভ্রমাত্মক ও চিত্তভ্রমকারী।
তখন মন্ডন মিশ্র কর্মকান্ডকে মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায় বলে আচার্যকে শাস্ত্রার্থে আহ্বান করলেন।
শ্রী রাজনারায়ণ মণ্ডল।