“ভয়হর মঙ্গল দশরথ রাম।
জয় জয় মঙ্গল সীতা রাম”।।
–‘হে রাম, হে দশরথাত্মজ, তুমি ভয়হারী এবং মঙ্গলময়। মঙ্গলময় তোমার ও সীতার জয় হউক’।
মর্যাদা-পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরামচন্দ্র হলেন সাক্ষাৎ ধর্ম স্বরূপ তথা ধর্মের সচল বিগ্রহ। পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ, যিনি সাক্ষাৎ বিষ্ণু, তিনিই ভূ-ভার হরণের নিমিত্ত, দুষ্টের দমন তথা অধর্মের বিনাশ করে ধর্মের সংস্থাপন এবং সাধু ভক্তদের রক্ষার্থে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ধন্য এই ভারতভূমি, ধন্য এই অযোধ্যাধাম, যেখানে ভগবান মানবরূপে অবতীর্ণ হয়ে নরলীলা সম্পাদন করেছেন। ভারতাত্মার দুই মূর্ত প্রতীক হলেন যথাক্রমে ত্রেতা যুগে আবির্ভূত ভগবান শ্রীরামচন্দ্র এবং দ্বাপর যুগে আবির্ভূত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। দেবর্ষি নারদ শ্রীরামচন্দ্রকে বলেছেন ‘নরচন্দ্রমাঃ’। রামায়ণ রচয়িতা মহর্ষি বাল্মিকীকে রামচরিত কথা শুনিয়েছিলেন দেবর্ষি নারদ। এরই পাশাপাশি স্বয়ং ব্রহ্মা বাল্মিকীকে বলেছিলেন যে, “যতদিন ধরাতলে গিরি-নদী সকল বিরাজ করবে ততদিন রামায়ণ কথা সংসারে প্রচারিত থাকবে”। তারপর কত যুগ অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। আজও রামায়ণ একইভাবে জনমানসে শ্রীরামের ভগবৎ সত্তা ও তাঁর মহিমার কথা প্রচার করে চলেছে। বস্তুত: রামায়ণ নিছকই পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য মাত্র নয়, ভারতের চিরন্তন ইতিহাসের মহান কাহিনীই রামায়ণের মধ্যে নিহিত আছে। যা কিছু ভারতের শাশ্বত সাধনা, চিরদিনের আদর্শ ও তপস্যা — তার সবকিছুই রামায়ণ যুগে যুগে মানুষকে শিক্ষা দিয়ে চলেছে। রামায়ণ তাই ভারতবর্ষের সনাতন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর পরম্পরার মূর্ত প্রতীক। (maryada purushottam bhagavan sriramachandra)

কেমন ভাবে আদর্শ মানুষ হতে হয়, রামায়ণ তারই শিক্ষা দেয়। শ্রীরামচন্দ্র রূপে পৃথিবীতে তাঁর আবির্ভাব এবং তাঁর পার্থিবলীলা কাহিনীই রামায়ণের মুখ্য উপজীব্য বিষয়। রামায়ণ তাই রামের মহিমা কীর্তন তথা আখ্যান এবং রামচরিতও বটে। রাম একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তাঁর মধ্যে কোন ত্রুটি পাওয়া যায় না। তিনি সর্বাঙ্গসুন্দর। সর্ব অর্থেই তিনি পুরুষোত্তম। তিনি “জিতেন্দ্রিয়, সংযত-চিত্ত, ধৃতিমান, বুদ্ধিমান, মহাবীর্যবান। নীতিজ্ঞ ও শ্রীমান। গাম্ভীর্যে সমুদ্রের তুল্য, ধৈর্যে হিমালয় সদৃশ, ক্রোধে কালাগ্নি সম এবং ক্ষমায় পৃথিবীর মতো। তিনি ধর্ম ও জীবলোকের রক্ষক, সর্বশাস্ত্র মর্মদর্শী এবং ধর্ম ও সত্যের মানবীয় মূর্তি”। সত্য, ত্যাগ এবং তপস্যাই তাঁর আত্মা। স্বয়ং দেবাদিদেব মহেশ্বর রাম নাম জপ করেন। রাম নিজেই আনন্দস্বরূপ। তাই তিনি ভক্তদের আনন্দ প্রদান করেন। এই নাম চতুর্বর্গ ফল অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ প্রদান করে থাকে। তুলসীদাসজীসহ ভারতের অগণিত মহাপুরুষ এই সারসত্য তাঁদের জীবনে উপলব্ধি করেছিলেন। (maryada purushottam bhagavan sriramachandra)
শ্রীরামচন্দ্র হলেন শরণাগতবৎসল এবং আশ্রিতজনের একমাত্র গতি। রামায়ণে রামকে সাধুগনের আশ্রয় ও রক্ষাকর্তা বলে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি অপ্রমেয় এবং স্বয়ং পরমাত্মা। তিনি নিজে কৃপা না করলে যোগীগণও তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করতে সমর্থ হন না। রামায়ণে আমরা দেখতে পাই যে, শ্রীরামচন্দ্র হলেন পরম করুণাময়। তাই তিনি বহু প্রকার দোষ থাকা সত্ত্বেও আশ্রয়প্রার্থনাকারীদের সর্বদাই আশ্রয় দেন এবং তাদের সর্বতোভাবে রক্ষাও করে থাকেন। তাঁর শ্রীচরণের মহিমায় পাষাণী অহল্যা নবজীবন লাভ করেছিলেন। বহুজনের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি রাবণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিভীষণকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে, রাবণের গুপ্তচরদের তিনি দণ্ড না দিয়ে মুক্তি দিয়েছিলেন। রাবণের মতো ভয়াবহ শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধের প্রসঙ্গেও আমরা রামের ঐশ্বরিক মহত্ত্বের প্রকাশ লক্ষ্য করে থাকি। যুদ্ধক্ষেত্রে রাম একাধিকবার পরাজিত, রণক্লান্ত এবং আহত রাবণকে রণভূমি পরিত্যাগ করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে বিশ্রামের জন্য সুযোগ দিয়েছিলেন। ওই অবস্থাতে রাম ইচ্ছা করলেই রাবণকে বধ করতে পারতেন। কিন্তু, রাম তা করেননি। এমনকি, যুদ্ধাবসানে রাবণ বধের পর, রাবণের শেষকৃত্য প্রসঙ্গে রাবণের ভ্রাতা বিভীষণকে শ্রীরামচন্দ্র বলেছিলেন যে, “মৃত্যুতে সকল শত্রুতার অবসান হয়। এরপর আর রাবণকে ঘৃণা করা উচিত নয়। আমি যুদ্ধে জয়লাভ করেছি। কেন আমি তাঁর উপর আর বিদ্বেষ ভাব রাখব? তুমি আমার মিত্র। আমরা এক। সেজন্য তোমার ভাই, আমারও ভাই। তোমার শেষ কর্তব্য করা উচিত। তুমি না করলে আমি নিশ্চয় করব”। স্বয়ং ভগবানের পক্ষেই, দুর্দান্ত শত্রুর প্রতিও এমন অপরিসীম মহত্ত্ব প্রদর্শন করা সম্ভব।
লক্ষ্য করবার মতো বিষয় হল এই যে, শুধুমাত্র মনুষ্যজাতি নয় এমনকি পশুপক্ষীরাও রামের কৃপালাভ করা থেকে বঞ্চিত হয়নি। সকলের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রামরাজ্য। রাম মর্যাদাসহকারে জটায়ু পক্ষীর অন্তিম সৎকার কার্য করেছেন এবং তাঁকে মোক্ষ প্রদান পর্যন্ত করেছেন। মহাপ্রস্থান কালে তিনি অযোধ্যার স্থাবর-জঙ্গম সকলকে, এমনকি তৃণকে পর্যন্ত মোক্ষ প্রদান করেছিলেন। এই কারণেই তিনি মর্যাদাপুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে ধর্মের স্থান চিরদিনই সবার থেকে উপরে। এই পৃথিবীতে বাস্তবিকই ধর্মক্ষেত্র বা ধর্মভূমি বলে যদি কোন ভূখণ্ডকে চিহ্নিত করতে হয়, তবে নিশ্চিত রূপেই তা হবে এই ভারতবর্ষ। এই ভারতে ধর্মকে চিরদিনই জীবন-যাপনের প্রধান ভিত্তি বলে গণ্য করা হয়েছে। গৃহস্থ থেকে তপস্বী, সম্রাট থেকে সন্ন্যাসী – সকলের ক্ষেত্রেই আধ্যাত্মিকতার বেদীর উপরেই জীবনবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতীয় জীবন-দর্শন অনুসারে পরম রূপবান, গুণবান, বিদ্বান, বুদ্ধিমান, প্রভূত ধন-সম্পদের অধিকারী, উচ্চ ও সম্মানীয় কুলে জাত এবং অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী কোন ব্যক্তিও যদি অনৈতিকতা ও অধর্মের পথ অনুসরণ করে চলে, তবে সে অত্যন্ত নিন্দার পাত্র হয়ে থাকে এবং সমাজের সর্বত্রই ধিক্কৃত হয়ে থাকে। রাবণের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। রামায়ণে রাবণ অধর্মের প্রতীক। রাবণের বিপরীতে রাম হলেন মূর্তিমান ধর্ম। রামের জীবনবেদ ধর্মের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। তিনি একইসঙ্গে শাস্ত্রের আধার এবং আধেয় উভয়ই হয়েছেন। বেদাদি শাস্ত্রে যে পরমপুরুষের মহিমা বন্দিত হয়েছে, যে পরমেশ্বরের জয়গান সনাতন হিন্দু ধর্মে অনন্তকাল ধরে হয়ে চলেছে, স্বয়ং তিনিই রাম অবতারে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই রামের মহিমা যেমন অনন্ত, রামকথাও তেমনই অনন্ত। এই কথা পঠন, শ্রবণ, মনন, কীর্তন, ব্যাখ্যা ইত্যাদিতে মানুষের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সাধন হয়ে থাকে। রামায়ণ পাঠ ও শ্রবণ তাই হিন্দুর পক্ষে অবশ্যই করণীয় কর্তব্য।
শ্রীরামচন্দ্রের মহিমার আখ্যান তথা রামায়ণ- কথা মানুষকে শক্তি প্রদান করে থাকে। নিঃসন্দেহে এই শক্তি হল আধ্যাত্মিক শক্তি, যা জাগতিক এবং পারমার্থিক উভয় প্রকার উন্নতি লাভেই সহায়ক। জীবনের বিভিন্ন রকম পরিস্থিতিতে সর্বদাই কিভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে পথ চলতে হয়, রামায়ণ তারই চিরন্তন প্রতিফলন। এই কারণেই বহু যুগ অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও, আজও রামায়ণের প্রাসঙ্গিকতা ক্রমবর্ধমান। এই কারণেই মানুষ রামায়ণ পাঠ করে আনন্দ, তৃপ্তি ও শান্তি লাভ করে। বস্তুত: লোকশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনেই মহাবিষ্ণুর অবতার শ্রীরামচন্দ্র পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাম তাই নিছকই একজন অবতার-পুরুষ বা ব্যক্তিত্বের নামমাত্র নয়। রাম অর্থে একটা আদর্শ, একটা গঠনমূলক ভাবনা এবং জীবন-যাপনের উচ্চতম তত্ত্বকে বোঝায়। রাম হল একটি বিচারধারার অপর নাম যা সমাজ থেকে সব রকম অপবিত্রতা এবং মলিনতাকে দূর করে সমাজকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শ্রীরামচন্দ্রের জীবনকথা তাই মানুষকে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের অভিমুখে, অন্ধকার থেকে আলোর অভিমুখে, মৃত্যু থেকে অমৃতের পথে যাত্রা করবার অনুপ্রেরণা জোগায় তথা শক্তি প্রদান করে থাকে। বর্তমান যুগে সারা পৃথিবী জুড়ে নানা রকম সমস্যা দেখা দিয়েছে। সনাতন হিন্দু ধর্মে মুনি -ঋষিরা সুপ্রাচীনকালেই বিভিন্ন রকম সমস্যার কথা ভেবে সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণার্থে শাস্ত্র গ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন। এই সকল শাস্ত্র গ্রন্থে বর্তমান কালের সমস্যাগুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ সমাধান পাওয়া যায়। রামায়ণও এগুলির মধ্যে অন্যতম। উল্লেখ্য যে, শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষাতেই নয়, বহু প্রাদেশিক ভাষাতেও রামায়ণ লেখা হয়েছে। তাছাড়া বহির্ভারতের বিভিন্ন ভাষাতেও রামায়ণ প্রসঙ্গ পাওয়া যায়।
হিন্দুবিদ্বেষীরা চিরদিনই নানাভাবে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিরোধিতা করে বিভিন্ন রকম কটূক্তি করে থাকে। হিন্দুদের এই সকল বিষয়ে সতর্কতা আবশ্যক। বাল্যকাল থেকেই পরিবারের বালক-বালিকা, শিশু- কিশোরদের ধর্মনিষ্ঠ করে তুলতে হবে। প্রতিটি হিন্দু গৃহে রামায়ণ অবশ্য পাঠ্য হওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে যে অধর্ম, অসত্য এবং অনৈতিকতাকে নাশ করবার অস্ত্রই হল রাম নাম এবং রামকথা। তাই ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের উপাসনা সর্বত্রই হওয়া দরকার; কারণ রামের উপাসনার অর্থই হলো ধর্মীয় চেতনার আলোকে এক ঐক্যবদ্ধ হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম – এই মহান সংকীর্তন ধ্বনিতে প্লাবিত হোক আসমুদ্রহিমাচল তথা সমস্ত বিশ্ব। হিন্দু ধর্ম সর্বত্র সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হোক। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সকলের কল্যাণ করুন, এটাই কাম্য।
বাল্মীকি রামায়ণ – হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য
আরও পড়ুন : রাঢ়বঙ্গের ধর্মঠাকুর – ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় স্বরূপ
ড. রামানুজ গোস্বামী স্মৃতিতীর্থ
(লেখক বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক)